শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা ও ধারাবাহিক লোকসানের মধ্যে দেশের বহু মিউচুয়াল ফান্ড নতুন করে বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫ কার্যকর হওয়ায়, টানা তিন বছর ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ ফান্ডগুলোর জন্য লিকুইডেশন বা রূপান্তরের পথ খুলে গেছে। ফলে টানা দুই অর্থবছর ডিভিডেন্ড না দেয়া ফান্ডগুলো চলতি অর্থবছরে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে না এলে এসব ফান্ডের তারল্য সঙ্কট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত বা অ-তালিকাভুক্ত ফান্ড টানা তিন বছর ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হলে ট্রাস্টিরা ইউনিট হোল্ডারদের সভা ডেকে ফান্ডটি লিকুইডেট করা হবে নাকি তালিকাভুক্ত ফান্ডকে ওপেন-এন্ডেডে রূপান্তর করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। ইউনিট হোল্ডারদের তিন-চতুর্থাংশ সম্মতি পেলে সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত গণ্য হবে। আগে এই ধরনের স্পষ্ট কাঠামো না থাকায়, দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা অনেক ফান্ড কার্যত ‘ঝুলে থাকা’ অবস্থায় চলছিল।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারের দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কারণে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বহু মিউচুয়াল ফান্ড কোনো ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছর এসব ফান্ডের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ম অনুযায়ী, টানা তিন বছর ডিভিডেন্ড না দিতে পারলে লিকুইডেশন বা রূপান্তরের ঝুঁকি তৈরি হবে। এই কারণে ফান্ড ব্যবস্থাপকরা চলতি অর্থবছরে অন্তত নামমাত্র ডিভিডেন্ড ঘোষণার চাপের মধ্যে রয়েছেন বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
মিউচুয়াল ফান্ডের পারফরম্যান্স সরাসরি শেয়ারবাজারের ওপর নির্ভরশীল। বিধিমালা অনুযায়ী, ফান্ডকে তাদের মোট সম্পদের অন্তত ৬০ শতাংশ তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে হয়। তবে বাস্তবে অধিকাংশ ফান্ড ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকলে এটি সুফল বয়ে আনে, কিন্তু দীর্ঘ মন্দায় এই উচ্চমাত্রার ইকুইটি এক্সপোজার ফান্ডগুলোর জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়।
তথ্য অনুযায়ী, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির অন্তত পাঁচটি মিউচুয়াল ফান্ড টানা দুই অর্থবছরে ডিভিডেন্ড বিতরণ করতে পারেনি। এসব ফান্ড হলো আইসিবি এএমসিএল ইউনিট ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল পেনশন হোল্ডারস ইউনিট ফান্ড, প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, বাংলাদেশ ফান্ড এবং আইসিবি এএমসিএল ইসলামিক ইউনিট ফান্ড। এর মধ্যে প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড একটি ক্লোজড-এন্ড ফান্ড, যা ২০২৯ সালে মেয়াদ শেষ হবে। অন্য ফান্ডগুলো ওপেন-এন্ডেড।
আইসিবি ছাড়া অন্যান্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির অধীনেও এমন ফান্ড রয়েছে, যারা গত দুই বছর ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। উদাহরণ হিসেবে রেস পরিচালিত ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে ডিভিডেন্ড দিয়েছে। পরবর্তী দুই বছর কোনো ডিভিডেন্ড না দেয়ায় এই ফান্ডটিও নতুন বিধিমালার আলোকে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
ট্রাস্টিরা সাধারণত দুটি পরিস্থিতিতে ইউনিট হোল্ডারদের সভা ডাকে—ফান্ডের রূপান্তর বা লিকুইডেশন। দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা ও কার্যকর রিটার্ন দিতে ব্যর্থ ফান্ডের ক্ষেত্রে লিকুইডেশনকে ‘শেষ বিকল্প’ হিসেবে দেখা হয়। তবে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান বিধিমালায় এই প্রক্রিয়া আরও কাঠামোবদ্ধ ও স্বচ্ছ হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই অর্থবছরে ক্লোজড-এন্ড ফান্ডগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে ছিল। যেসব ফান্ডের পোর্টফোলিওতে শেয়ারের দাম বেশি ছিল, সেগুলো বাজার পতনের কারণে মারাত্মক মূল্যক্ষয়ের শিকার হয়েছে। অনেক ফান্ডের ইউনিট নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইউনিট হোল্ডারদের বিনিয়োগের ওপর। এই পরিস্থিতিতে ডিভিডেন্ড দেয়ার মতো বিতরণযোগ্য আয় তৈরি হয়নি।
একই সময়ে সামগ্রিক শেয়ারবাজারেও বড় পতন দেখা গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯.৪ শতাংশ বা ৫০২ পয়েন্ট কমে যায়। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পতন আরও তীব্র হয়ে সূচক ১৬ শতাংশ বা ১,০১৫ পয়েন্ট কমে যায়। ধারাবাহিক এই পতন মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর আয় ও মূলধনে সরাসরি আঘাত হেনেছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মুখপাত্র মো: আবুল কালাম বলেন, সংশোধিত বিধিমালার মাধ্যমে মিউচুয়াল ফান্ড লিকুইডেশনের সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি হয়েছে। তবে কোনো ফান্ড লিকুইডেট হবে নাকি রূপান্তরিত হবে, তা পুরোপুরি ইউনিট হোল্ডারদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তিনি জানান, ইউনিট হোল্ডারদের তিন-চতুর্থাংশ সম্মতি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারী ইফতেখার উল আজিম বলেন, কোনো ফান্ড যদি টানা তিন বছর ডিভিডেন্ড না দেয়, তার ইউনিটের বাজারদর বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, নতুন বিধান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোকে চলতি বছরে অন্তত নামমাত্র ডিভিডেন্ড ঘোষণায় বাধ্য করবে। অন্যথায় অনেক কোম্পানির কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাবে।
ওপেন-এন্ডেড ফান্ডগুলোর ক্ষেত্রে আরেকটি চাপ তৈরি হয়েছে ইউনিট রিডেম্পশনের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব ফান্ড থেকে বিনিয়োগকারীরা তাদের টাকা তুলে নিচ্ছেন। বাজারে আস্থা কমে যাওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতি স্বীকার করে ইউনিট সারেন্ডার করছেন। এতে ফান্ডগুলোর তারল্য পরিস্থিতি আরও সংকীর্ণ হচ্ছে। বাজারে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার না হলে, ওপেন-এন্ডেড ফান্ডগুলোর আর্থিক অবস্থাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা একদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করেছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন দুর্বল পারফরম্যান্স দেখানো ফান্ডগুলোর জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। চলতি অর্থবছরে ডিভিডেন্ড ঘোষণার সক্ষমতা এবং বাজার পরিস্থিতির উন্নতি—এই দুইয়ের ওপর নির্ভর করবে অনেক ফান্ডের ভবিষ্যৎ। বাজার না ঘুরে দাঁড়ালে লিকুইডেশন ও রূপান্তরের ঘটনা বাড়তে পারে, যা দেশের পুঁজিবাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

