নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল ভূমিকা ও দীর্ঘদিনের অনিয়মে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। লেনদেনে দেখা দিয়েছে খরা। বাজার দীর্ঘদিন ধরেই মন্দার মধ্যে আছে। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও আসেনি। সব মিলিয়ে দেশের শেয়ারবাজার এখন কার্যত গতিহীন অবস্থায় রয়েছে।
শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৫ বছরে ধারাবাহিক অনিয়ম বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে নষ্ট করেছে। সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণার ঘটনায় সেই আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এ পরিস্থিতির দায় তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপরই দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, অতীতেও বাজারে খারাপ সময় গেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নজিরবিহীনভাবে ভয়াবহ।
বিশ্লেষকেরা আরও জানান, বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় ৫০ শতাংশই কার্যকর উৎপাদনে নেই। এতে বাজারে স্বাভাবিক গতি ফিরছে না। শেয়ারবাজারে প্রাণ ফেরাতে হলে দ্রুত কিছু ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানির আইপিও আনা জরুরি। ভালো মানের কোম্পানি বাজারে এলে বিনিয়োগের নতুন বিকল্প তৈরি হবে। নতুন বিনিয়োগকারীও বাজারে আসবেন। এর ইতিবাচক প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো শেয়ারবাজারে ছড়িয়ে পড়বে।
দেশের শেয়ারবাজারে সংকট গভীর হচ্ছে, ব্রোকারেজ হাউজগুলো টিকে থাকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, প্রতিদিন গড়ে এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হলে অধিকাংশ ব্রোকারেজ হাউজ ব্রেক-ইভেন্টে থাকতে পারে। অথচ কয়েক বছর ধরে দৈনিক লেনদেন তিনশ থেকে পাঁচশ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। মাঝে মাঝে লেনদেন বাড়লেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। বরং প্রায়ই লেনদেন নেমে আসে দুইশ কোটি টাকার কাছাকাছি। এতে অনেক ছোট ও মাঝারি ব্রোকারেজ হাউজের টিকে থাকা কঠিন হয়ে গেছে। ডিএসইতে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ডাইরেকশন লেস’ বা উদ্দেশ্যহীন বলে অভিহিত করেছেন ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাজার কোন দিকে যাচ্ছে তা কেউ জানে না।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাত্র ২১ কার্যদিবসে ডিএসইতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। বিপরীতে ১২৬ কার্যদিবসে লেনদেন ছিল তিনশ কোটি টাকার কম। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ছিল ৬ হাজার ১৫ পয়েন্ট। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি লেনদেন শেষে সূচক নেমে এসেছে ৪ হাজার ৯৩৯ পয়েন্টে। অর্থাৎ দেড় বছরের ব্যবধানে প্রধান সূচক কমেছে ১ হাজার ৭৬ পয়েন্ট।
ডিএসইর পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, “সম্প্রতি বাজারে যে লেনদেন হচ্ছে, এতে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর জন্য স্বাভাবিকভাবে কাজ চালানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে ছোট ব্রোকারদের অবস্থা খুবই খারাপ। বাজারের অবস্থা নাজুক।” দীর্ঘমন্দায় প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় বিনিয়োগকারীরা প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, বাজারে সবসময় কিছু মার্কেট প্লেয়ার থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজার এত নিষ্প্রাণ যে মার্কেট প্লেয়ার সংকট তৈরি হয়েছে। বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা প্রায় সবাই সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। সব মিলিয়ে শেয়ারবাজার কঠিন সময় পার করছে।
সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক — ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক — শেয়ার শূন্য ঘোষণা করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন একটি ব্যাংক গঠন করেছে। এতে এসব ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের সম্পূর্ণ বিনিয়োগ হারিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তাদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেনি।
ডিএসইর পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, “সার্বিকভাবে বাজার এখন গতিহীন। দীর্ঘদিন ধরে আইপিও নেই। স্টক মার্কেটের যে মৌলিক উপাদানগুলো থাকা উচিত, তার কোনোোটিই নেই।”
একজন ডিএসই সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য করার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বলির পাঠা বানানো হয়েছে। ৫ আগস্টের আগে এই ব্যাংকগুলো নিয়মিত লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে এবং আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা দেখিয়েছে। এখন হঠাৎ বড় লোকসান দেখানো হচ্ছে। এটা একদিনে হয়নি। সুতরাং আগের আর্থিক প্রতিবেদনগুলো সম্ভবত জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।”
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি আর্থিক প্রতিবেদনে জালিয়াতি হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো? যে অডিটর প্রতিবেদন অডিট করেছেন, তার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থা — বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা তদারকির দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা হয়েছে? ব্যাংকের অর্থ লোপাটকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
তিনি বলেন, “দেখা যাচ্ছে অনিয়মে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়েছে। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাও এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা একেবারে নষ্ট হয়েছে।”
আইপিহীন বাজার:
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওকে শেয়ারবাজারের ‘নতুন রক্ত’ হিসেবে দেখা হয়। দেশের শেয়ারবাজারে সর্বশেষ আইপিও এনেছে টেকনো ড্রাগস। ২০২৪ সালের জুনে কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে। এরপর দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কোনো নতুন আইপিও আসেনি। দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় ধরে আইপিও না আসার ঘটনা আগে ঘটেনি।
যদিও ২০২৫ সালে কোনো নতুন আইপিও আসেনি, ২০২৪ সালে চারটি কোম্পানি আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করেছে। তার আগে ২০২৩ সালে চারটি, ২০২২ সালে ছয়টি, ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২০ সালে ৮টি, ২০১৯ সালে ৯টি, ২০১৮ সালে ১৪টি, ২০১৭ সালে ৮টি, ২০১৬ সালে ১১টি, ২০১৫ সালে ১২টি, ২০১৪ সালে ২০টি, ২০১৩ সালে ১২টি, ২০১২ সালে ১৭টি, ২০১১ সালে ১৩টি, ২০১০ সালে ১৮টি এবং ২০০৯ সালে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের আইপিও হয়। দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে শেয়ার ছাড়ছেন। নানা অনিয়ম ও দীর্ঘমন্দার কারণে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এই ধারা শুরু হয়েছে এবং এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ৪৩ হাজার ৫৪৬টি। ২০২৩ সালের ৩০ জুন এই সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার ৯০৭টি। অর্থাৎ ছয় মাসে কমেছে দুই হাজার ৩৬১টি। এর আগের দিকে, ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবরের পর থেকে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব কমেছে ১১ হাজার ৯৬৬টি।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজার সম্পূর্ণ গতিহীন। এটি ডাইরেকশন লেস, কোন দিকে যাচ্ছে কেউ জানে না।” তিনি বলেন, “গত ১৫ বছরের অনিয়ম এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের অভিজ্ঞতা থেকে বাজারের এই পরিস্থিতি এসেছে। পুনরায় নতুনভাবে শুরু করাই একমাত্র সমাধান।”
সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করে নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হলেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়নি। সাইফুল ইসলাম এটিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন দেখে শেয়ার কিনেছে। এখন তারা নিঃস্ব হয়েছে। যেসব ব্যক্তি ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা অর্থ লুট করেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের উপর এ ধরনের ঝুঁকি ঠেলা ঠিক হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “বাজারে গতি ফিরাতে হলে ভালো কোম্পানির আইপিও আনা জরুরি। বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ৫০ শতাংশই উৎপাদনে নেই। নতুন ভালো কোম্পানির আইপিও বাজারে বিকল্প বিনিয়োগ সৃষ্টি করবে এবং নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন ঘটাবে। তখন বাজারের গতিও ফিরবে।”
ডিএসইর পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, “সার্বিকভাবে বাজার এখন গতিহীন। দীর্ঘদিন ধরে আইপিও নেই। স্টক মার্কেটের মৌলিক উপাদানগুলো অনুপস্থিত। পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণায় বাজারে বড় আঘাত এসেছে। মানুষ আর্থিক প্রতিবেদন দেখে বিনিয়োগ করেছে। যদি এভাবে রাতারাতি শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়, তবে বিনিয়োগকারীর আস্থা কিভাবে ফিরে আসবে?”
তিনি বলেন, “যারা ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন সার্টিফাই করেছে, তাদের দায়বদ্ধতা কোথায়? পাঁচ ব্যাংকের ঘটনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা একেবারে নষ্ট করেছে। বাজারের প্রাণশক্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এরকম বাজারে মানুষের অনীহা বিরল।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কি ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা স্পষ্ট করতে হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কিছুটা স্বস্তি মিলবে।”
ডি রোজারিও আরও বলেন, “বাজারে গতি ফিরাতে হলে শুধু কোনো আইপিও নয়, ভালো মানের কোম্পানির আইপিও আনতে হবে। দুটি-তিনটি সাড়া জাগানো কোম্পানির আইপিও বাজারে ফিরলে নতুন গতি আসবে।”

