দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ শেয়ারবাজার মন্দার, সংকোচনের ও আস্থাহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের অনেকদিনের দাবি ছিল—বহুজাতিক কোম্পানি সহ শক্তিশালী, মৌলিক ভিত্তিসম্পন্ন ও বৈচিত্র্যময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা। তবে এখনো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি বাস্তবতার চেয়ে ‘অলীক স্বপ্ন’ মনে হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে, তরলতা বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগও আকৃষ্ট হবে। শেয়ারবাজারের গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ভালো কোম্পানি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও সরকারের আন্তরিকতার অভাবে তা সফল হয়নি। শেয়ারবাজারের মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তালিকাভুক্তি নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। এর ফলে আশা করা হয়েছিল এই সরকারের মেয়াদে কিছু ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা আগের মতোই স্থবির।
গত বছরের ১১ মে যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে তার সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান, অর্থ উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে পুঁজিবাজারের সঠিক অবস্থা পর্যালোচনা করা হয় এবং বড় বড় কোম্পানি তালিকাভুক্তি ও বাজার উন্নয়নের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশনা দেন।
প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছে। সবশেষ গত ৭ জানুয়ারি কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড, ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, সিনোভিয়া বাংলাদেশ লিমিটেড, নোভার্টিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং নেসলে বাংলাদেশ পিএলসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থ উপদেষ্টার সভাপতিত্বে সচিবালয়ে বৈঠক হয়।
বৈঠকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হলেও তাদের পক্ষ থেকে খুব একটা ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানগুলো দায়সারা উত্তর দিয়েছে। তারা জানিয়েছে—তালিকাভুক্তি বিষয়ে বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে, বোর্ডে আলোচনা না করে তাদের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাদের কথার ধরন দেখে মনে হয়েছে তারা তালিকাভুক্তি চান না। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে ইতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেছে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি প্রসেসের ধীরগতি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অনীহা বাজারকে স্থবির রাখছে। সরকার যদি প্রকল্পে আরও উদ্যোগী হয় এবং কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দেয়, তাহলে বাজারের গভীরতা বাড়ানো সম্ভব।
বৈঠকে উপস্থিত এক সূত্র নাম প্রকাশ না করে জানান, শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়ানোর লক্ষ্য ১০টি লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সরকারের শেয়ার থাকা বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সে লক্ষ্যেই ১০টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে বৈঠক হয়। কিন্তু বৈঠকে অংশগ্রহণ করা বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধিদের মনোভাব দেখে মনে হয়েছে তারা তালিকাভুক্ত হতে চায় না। সূত্রটি আরও জানায়, তাদের বক্তব্য দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া নির্দেশ করে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারি বলেন, “যে সব বহুজাতিক কোম্পানি এই দেশ থেকে প্রচুর আয় করছে তাদের দায়বদ্ধতা আছে দেশীয় মানুষকে মালিকানার অংশ কিছুটা দেওয়ার। বাইরের দেশে এ ধরনের দায়িত্ব আইন করা হয়েছে। আমাদের দেশেও প্রয়োজন হলে আইন প্রণয়ন করে এটি করা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “শেয়ারবাজারে আসার ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনা হতে পারে, যা ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত সীমিত। তবে বাধ্যতামূলকভাবে শেয়ারবাজারে আসার নিয়ম থাকা উচিত। অতীতে সরকার কখনো এই পদক্ষেপ নেয়নি। অনেকে ভেবেছেন এ করলে বিদেশি বিনিয়োগ কমবে, যা ঠিক নয়। এখানে ব্যবসা আছে বলেই তারা এসেছে, ব্যবসা থাকলে নিয়ম মেনে আসবে।”
সরকারি ভালো কোম্পানির শেয়ারবাজারে না আসার কারণেও তিনি আলোকপাত করেন। তার মতে, অতীতে সরকারি শেয়ার আসেনি, কারণ স্বাধীন পরিচালকরা রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত। বোর্ডের বাইরে সুবিধা পাওয়ার কারণে তারা শেয়ার তালিকাভুক্তি নিয়ে আপত্তি জানাতে পারে। তবে বর্তমান অরাজনৈতিক সরকারের আমলে এসব প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা সহজ হবে। রোজারি মনে করেন, “সরকারি ভালো প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে শুধু বিনিয়োগকারীরাই নয়, সরকারও লাভবান হবে। বর্তমান সরকারের কাজ হওয়া উচিত নির্বাচিত সরকারের আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া।”
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “আলোচনা মাধ্যমে কিছু হবে বলে মনে হয় না। এই সরকারের সময় একটিও শেয়ার বাজারে আসেনি। যদি বহুজাতিক ও সরকারি ফান্ডামেন্টাল প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত হতো, শেয়ারবাজারের অনেক উপকার হতো।”
সরকারি ভালো কোম্পানিগুলো কেন শেয়ারবাজারে আসে না—এ বিষয়ে আইসিবি চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, “সমস্যাটা পরিচালনা পর্ষদের। যারা বোর্ডে আছেন তারা চান না শেয়ারবাজারে আসুক। হয়তো তারা অন্য কোনো সুবিধা পান, তালিকাভুক্ত হলে তা চলে যাবে। আমি বলব, যদি তারা ইনসেনটিভ চায়, করছাড় চায়—দেওয়া হোক। আর যদি না আসে, কর বাড়িয়ে দিতে হবে। ভেরি সিম্পল। না হলে আরও বহুদিন অপেক্ষা করতে হবে।”
সরকারি মৌলভিত্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে না আসাকে তিনি বৈষম্য হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, “এ বৈষম্য দূর করতে সরকারি সিদ্ধান্ত অপরিহার্য। সরকার আন্তরিকভাবে চাইলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত করা সম্ভব।”
গত ৭ জানুয়ারি বহুজাতিক ও সরকারি ১০টি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, “ওখানে আমাদেরও শেয়ার আছে, কিন্তু তালিকাভুক্ত নয়। তারা বলেছে, সিদ্ধান্ত বোর্ড ছাড়া হবে না। তবে সরকার থেকে আমরা সম্মতি দিয়েছি। কোম্পানি আইন জটিল, আমরা তা উপেক্ষা করতে পারি না। আমরা চেষ্টা করছি।”
আবার আইসিবি চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, “নেসলে যদি বোম্বেতে তালিকাভুক্ত থাকতে পারে, আমাদের এখানে সমস্যা কী? ইউনিলিভার জিএসকের অংশ তালিকাভুক্ত, মূল অংশ নয়। পাকিস্তান, থাইল্যান্ডে তালিকাভুক্ত। যদি ইনসেনটিভ চায়—দেওয়া হোক। না হলে কর বাড়াতে হবে। সরকারী শেয়ারও বিক্রি করতে পারবে না? এখানে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বিদেশি বোর্ড মিটিংয়ের কারণে।”
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম মন্তব্য করেন, “আলোচনা মাধ্যমে কিছু হবে বলে মনে হয় না। এই সরকারের সময় একটিও শেয়ার বাজারে আসেনি। যদি বহুজাতিক ও সরকারি ফান্ডামেন্টাল প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত হতো, শেয়ারবাজারের অনেক উপকার হতো।”
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি প্রসেস ধীর, জটিল এবং রাজনৈতিক প্রভাবিত। বহুজাতিক কোম্পানির অনীহা ও সরকারি পরিচালনা পর্ষদের দ্বন্দ্ব বাজারকে স্থবির রেখেছে। সরকারের সক্রিয় পদক্ষেপ, প্রণোদনা বা আইনগত বাধ্যবাধকতা ছাড়া তালিকাভুক্তি সম্ভব নয়। বাজারের গভীরতা ও তরলতা বাড়াতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

