গত সপ্তাহে দেশের পুঁজিবাজারে স্পষ্টভাবেই ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছে। টানা স্থবিরতা ও বিনিয়োগকারীদের শঙ্কার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচক ও লেনদেন—উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য উর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। আলোচ্য সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ, আর একই সময়ে দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে ৫১ শতাংশের বেশি। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ খাতেই বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক রিটার্ন পেয়েছেন।
বাজার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সপ্তাহ শেষে ডিএসইএক্স সূচক আগের সপ্তাহের তুলনায় ১৪০ দশমিক ৬২ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ১০০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর আগের সপ্তাহ শেষে এই সূচক ছিল ৪ হাজার ৯৫৯ পয়েন্টে। বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ দশমিক ১৬ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৯৬৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যেখানে আগের সপ্তাহ শেষে ছিল ১ হাজার ৯১৩ পয়েন্ট।
এদিকে শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসইএস গত সপ্তাহে ২৯ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ২৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, আগের সপ্তাহে যা ছিল ৯৯৬ পয়েন্ট।
ডিএসইতে গত সপ্তাহে মোট ৩৮৮টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৩০৯টির শেয়ারের দর বেড়েছে, ৪১টির দর কমেছে এবং ৩৮টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এ ছাড়া ২৫টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের বাইরে ছিল।
সূচকের উত্থানে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্র্যাক ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ। এসব বড় ও প্রভাবশালী কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ায় বাজারে আস্থার সঞ্চার হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
লেনদেনের দিক থেকেও ডিএসইতে গত সপ্তাহে ছিল চোখে পড়ার মতো গতি। পাঁচ কার্যদিবসে ডিএসইতে দৈনিক গড়ে ৫৭৫ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে যেখানে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৩৮০ কোটি ১২ লাখ ১০ হাজার টাকা, সেখানে এক সপ্তাহেই লেনদেন বেড়েছে ৫১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বাজারে তারল্য বাড়ার এই প্রবণতাকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতভিত্তিক লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে সাধারণ বীমা খাত সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারীর দৃষ্টি কেড়েছে। ডিএসইর মোট লেনদেনের ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ ছিল এই খাতের দখলে।
দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাত, যার দখলে ছিল ১৬ দশমিক ১৬ শতাংশ লেনদেন। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ব্যাংক খাতের লেনদেনের অংশ ছিল ১১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এরপর বস্ত্র খাত ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাত ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ লেনদেন নিয়ে শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নেয়।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে দুটি খাত বাদে প্রায় সব খাতেই ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো করেছে সাধারণ বীমা খাত, যেখানে রিটার্ন ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।
এ ছাড়া জীবন বীমা খাতে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, সিমেন্ট খাতে ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং ভ্রমণ ও অবকাশ খাতে ৫ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে দুর্বল পারফরম্যান্স দেখা গেছে চামড়া খাতে, যেখানে রিটার্ন ছিল দশমিক ৩৮ শতাংশ নেতিবাচক। পাশাপাশি পাট খাতে দশমিক ১৮ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন লক্ষ্য করা গেছে।
ঢাকার পাশাপাশি দেশের আরেক পুঁজিবাজার চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) গত সপ্তাহে ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে ১৪ হাজার ২৬১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আগের সপ্তাহে ছিল ১৩ হাজার ৯২২ পয়েন্ট।
এ ছাড়া সিএসসিএক্স সূচক সপ্তাহের ব্যবধানে ২ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়ে ৮ হাজার ৮৩০ পয়েন্টে পৌঁছেছে, আগের সপ্তাহে যা ছিল ৮ হাজার ৬২২ পয়েন্ট।
লেনদেনের দিক থেকেও সিএসইতে গতি বেড়েছে। গত সপ্তাহে সেখানে ৫৮ কোটি ১৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে, আগের সপ্তাহে যা ছিল ৩২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আলোচ্য সপ্তাহে সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৯৭টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১৯৭টির দর বেড়েছে, ৭২টির দর কমেছে এবং ২৮টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
সব মিলিয়ে, সূচক, লেনদেন ও খাতভিত্তিক রিটার্ন—সব দিক থেকেই গত সপ্তাহের পুঁজিবাজারে এক ধরনের স্বস্তির বার্তা মিলেছে। তবে এই ইতিবাচক ধারা কতটা টেকসই হবে, সেটিই এখন বিনিয়োগকারীদের বড় প্রশ্ন।

