দীর্ঘদিন অনিয়ম, দুর্নীতি ও পরিচালকদের লুটপাটের কারণে চরম দুর্বল অবস্থায় থাকা বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
গতকাল সোমবার পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি দর বৃদ্ধি দেখা গেছে এমন ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭টি ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এই কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর দীর্ঘদিন ধরে ফেসভ্যালুর নিচে অবস্থান করছিল। চলমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১২ ফেব্রুয়ারি) ঘনিয়ে আসায় বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসব কোম্পানির শেয়ারদরের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, কিছু অসাধু বিনিয়োগকারী নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা পুঁজি করে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদর ফুলিয়ে মুনাফা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ নিয়ে বাজারে কারসাজির অভিযোগও উঠেছে। আলোচিত বিনিয়োগকারী ও সমবায় অধিদপ্তরের উপনিবন্ধক মো. আবুল খায়ের হিরুসহ কয়েকজনকে এই নতুন খেলায় যুক্ত থাকার অভিযোগ করা হচ্ছে।
বিশেষভাবে, মো. আবুল খায়ের হিরুর ফেসবুক পোস্টের পর পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বমুখী ধারা লক্ষ করা গেছে। একই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা এস আলম গ্রুপ ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ কমায় এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
পুঁজিবাজারে চলমান অস্বাভাবিক শেয়ারদরের খেলায় যুক্ত হয়ে এক সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ও চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসলামী ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদরও হঠাৎ বেড়ে গেছে। গতকাল সোমবার সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দুই ব্যাংকের শেয়ারদর এক লাফে প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের শেয়ারদর ০.৬৫ পয়সা থেকে বেড়ে ০.৭২ পয়সায় পৌঁছেছে। ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টম্যান্ট লিমিটেডের শেয়ারদর বেড়ে ০.৬৬ পয়সা থেকে ০.৭৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন সার্ভিসেস লিমিটেডের শেয়ারদর ০.৬৮ পয়সা থেকে বেড়ে ০.৭৫ পয়সা হয়েছে। ফাস্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডের শেয়ারদর ৩.১০ টাকা থেকে বেড়ে ৩.৪০ টাকা পৌঁছেছে। উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টম্যান্টস লিমিটেডের শেয়ারদর ১০.৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১১.৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের শেয়ারদর ০.৮০ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে। দি ঢাকা ডাইং অ্যান্ড ম্যানুফেকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ারদর ১৪.৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ টাকায় পৌঁছেছে।
প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের শেয়ারদর ০.৬৩ পয়সা থেকে বেড়ে ০.৬৯ পয়সায় উঠেছে। বিশেষত, ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদর ৪৭.৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৫২.৪০ টাকায় পৌঁছেছে। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদর ১৪.৭০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫.৭০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। ফলে এক দিনে ইসলামী ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদর যথাক্রমে ৯.৮৫ শতাংশ এবং ৯.৮৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত সপ্তাহে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদর হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এবং পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন সার্ভিসেস লিমিটেডের শেয়ারদর এই সপ্তাহে প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের শেয়ারদর ১০.৭৬%, ফাস ফাইন্যান্সের ১০.৬০%, এবং পিপলস লিজিংয়ের ১০.২৯% বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েছে। ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ৯.৫৯%, উত্তরা ফাইন্যান্স ৯.৬১%, ফাস্ট ফাইন্যান্স ৯.৬৮%, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড ৯.৫২%, এবং দি ঢাকা ডাইং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড ৯.৫৮% বেড়েছে। তবে এসব কোম্পানির বেশির ভাগের শেয়ারদর এখনও ফেসভ্যালুর নিচে অবস্থান করছে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠনের প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন পর বাজারে বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হচ্ছেন। এর ফলে লেনদেন বাড়ছে। যদি সামনে সংস্কার ও স্বচ্ছতা আরও জোরদার হয়, তাহলে বাজারের এই গতি টেকসই হতে পারে।”
চেয়ারম্যান আরও জানান, যেসব কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি পেয়েছে, সেগুলো মূলত সঠিক মূল্যায়নের দিকে এগোচ্ছে। নতুন সরকার যদি সুদের হার কমায়, তাহলে বাজারে আরও সুদিন ফিরতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া:
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের খবরে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করেছেন। এর ফলে লেনদেন বাড়েছে। এটি পুঁজিবাজারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক খবর।”
ডিএসইতে শেয়ারদরের ঊর্ধ্বমুখী প্রভাবের কারণে গত পাঁচ মাসে সূচক ও লেনদেনে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে সূচকের ৫৪ শতাংশ উত্থানের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করেছে। দিনভর ক্রেতাদের আধিপত্য থাকায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে।
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫৪.৩৯ পয়েন্ট বেড়ে ৫,২৪৭.৭৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের ৭ অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বশেষ ৯ অক্টোবর সূচক ৫,২৮৩ পয়েন্ট অতিক্রম করেছিল। খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে দরপতনের মধ্যে থাকা পুঁজিবাজার এবার আবার গতি পেতে শুরু করেছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের অধীনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়তে পারে।
পুঁজিবাজারের প্রধান সূচকের পাশাপাশি অন্যান্য সূচকেও উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ১২.৯৬ পয়েন্ট বেড়ে ১,০৫৫.৮৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। ব্লু-চিপ সূচক ডিএসই-৩০ বেড়েছে ২০.৫৯ পয়েন্ট, যা দিন শেষে দাঁড়িয়েছে ২,১৭০.৮৩ পয়েন্টে। ডিএসইতে এদিন মোট ৩৯০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২১৫টির দর বেড়েছে, ১০৭টির দর কমেছে, এবং ৬৮টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
লেনদেনের পরিমাণেও বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ৭৪৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা, যা চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগের কার্যদিবসে লেনদেন ছিল ৬২৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১১৯ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)তেও বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। এদিন মোট প্রায় ৮ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৮টির দর বেড়েছে, ৬০টির দর কমেছে, এবং ২৫টির দর অপরিবর্তিত ছিল। পাশাপাশি সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১১১.৩৫ পয়েন্ট বেড়ে ১৪,৬৯১.৩৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেনে এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আগামী নির্বাচনের আগে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

