জাতীয় নির্বাচনের আগের শেষ কর্মদিবসে দেশের শেয়ারবাজারে দেখা গেল উল্লেখযোগ্য উত্থান। আগের দিনের বড় লাফের পর গতকাল মঙ্গলবারও প্রধান সূচকে শক্তিশালী ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স প্রায় ৮৮ পয়েন্ট বেড়ে ৫৪০০ পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। টানা দুই কার্যদিবসে সূচকটি মোট বেড়েছে প্রায় ১৭১ পয়েন্ট, যা শতাংশের হিসেবে সোয়া ৩ শতাংশের মতো।
এই উত্থানকে ঘিরে বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক দুই প্রেক্ষাপটই বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তাদের আরোপ করা ‘পাল্টা শুল্ক’ ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে নিয়মিত শুল্কের বাইরে অতিরিক্ত কোনো শুল্ক দিতে হবে না।
এটি রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এ সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে—এমন কোনো বাণিজ্য চুক্তি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে করা হবে না।
বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন শেষে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠনের সম্ভাবনাও অর্থনীতিতে স্থবিরতা কাটবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এই প্রত্যাশা থেকেই শেয়ার কেনার আগ্রহ বাড়ে, যা সূচক বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার মূল মার্কেটে ৩৫২টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২৬৬টির দাম বেড়েছে, ৬১টির কমেছে এবং ২৫টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ বাজারে স্পষ্টভাবেই ক্রেতা প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেছে।
লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আগের দিনের তুলনায় ১৪৪ কোটি টাকা বেশি লেনদেন হয়ে মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৯০ কোটির বেশি। এটি গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ লেনদেন, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ব্যাংক খাতে শক্তিশালী প্রভাব
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে ব্যাংক খাত। লেনদেন হওয়া ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে ২৯টির শেয়ারদর বেড়েছে। গড়ে এ খাতের দর প্রায় পৌনে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সূচকে ৫০ পয়েন্টের বেশি যোগ করেছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবদান এসেছে ওষুধ ও রসায়ন খাত থেকে। এ খাত সূচকে প্রায় ১০ পয়েন্ট যোগ করেছে। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল, বস্ত্র, সিমেন্ট ও তথ্য-প্রযুক্তি খাতের অধিকাংশ শেয়ারের দাম বেড়েছে। তবে বীমা খাতে ছিল মিশ্র প্রবণতা।
দিনের শেষ পর্যন্ত ৩৬টি কোম্পানির শেয়ার সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হয়েছে। এর বেশিরভাগই দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উত্থান বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কতার ইঙ্গিতও বহন করে। কারণ মৌলভিত্তি দুর্বল কোম্পানিতে অতিরিক্ত জল্পনা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
টানা দুই দিনের শক্তিশালী উত্থান বাজারে নতুন গতি এনেছে। তবে এই ধারা টেকসই হবে কিনা, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ধারাবাহিকতার ওপর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজারে আশাবাদ বাড়লেও সতর্ক বিনিয়োগ কৌশলই হতে পারে নিরাপদ পথ।

