দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ সাম্প্রতিক সময়ে হ্রাস পেয়েছে। ডলার সংকট, মুদ্রার বিনিময় হার অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কিছুটা কমেছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন। বাজারে লেনদেনের পরিমাণ সামান্য বেড়েছে, তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং বাজারের আকার বিবেচনায় বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ এখনও উন্মুক্ত আছে বলে তারা মনে করছেন।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নীতিগত স্বচ্ছতা বিবেচনা করে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং বিনিময় হার অস্থিরতার কারণে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তাই নতুন বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আসছে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশ এখনও সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিদেশিরা এখন ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ অবস্থানে আছেন। অর্থনৈতিক সূচকগুলো স্থিতিশীল হলে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হলে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এছাড়া নির্বাচিত সরকারের পুঁজিবাজার নীতি এবং পদক্ষেপও তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল আমিন বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগ টানতে হলে বাজারে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ, করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার এবং নীতিগত সিদ্ধান্তে পূর্বাভাসযোগ্যতা থাকলে বিদেশিদের আস্থা বাড়বে।”
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত প্রায় ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৩২টিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীর অংশীদারিত্ব রয়েছে। বিদেশি মালিকানার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যেখানে ৩৬.০৬ শতাংশ শেয়ার বিদেশিদের হাতে। এরপর অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজে ৩২.৮৩ শতাংশ, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে ২৭.৩৫ শতাংশ এবং নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসে ১৯.৬৪ শতাংশ শেয়ার বিদেশিদের।
ডিএসইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বিদেশিরা মোট প্রায় ১২০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। একই সময়ে শেয়ার কেনা হয়েছে মাত্র ৬০ লাখ টাকার। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টে; নভেম্বরের ৩.৬৯ শতাংশ মালিকানা ডিসেম্বরের শেষে কমে শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশে নেমেছে।
সিটি ব্যাংকেও বিদেশি মালিকানা কমেছে শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ। গ্রামীণফোনের বিদেশি মালিকানা ০.৮৭ থেকে কমে ০.৮০ শতাংশ হয়েছে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালেও ডিসেম্বর মাসে বিদেশি মালিকানা নেমে এসেছে ১৪.৫২ শতাংশে। ব্র্যাক ব্যাংক, রেনাটা, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও যমুনা অয়েলেও বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা কমেছে। তবে প্রাইম ব্যাংক, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ও ন্যাশনাল ব্যাংকে বিদেশি মালিকানা সামান্য বেড়েছে। বর্তমানে ডিএসইতে বিদেশি বিনিয়োগের মোট পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
বাজার সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদেশিরা শেয়ার কেনাবেচায় নিট বিক্রির প্রবণতা দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে ব্যাংক, বহুজাতিক ও বড় মূলধনি শেয়ারে লেনদেন বেশি হলেও নতুন বড় বিনিয়োগ আসছে না। ডলার রেপাট্রিয়েশন ও বিনিময় হার ঝুঁকি তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা খোঁজেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশীয় চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে তারা সতর্ক। অর্থনীতিবিদদের মতে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে কর কাঠামো সহজ করা, লভ্যাংশ ও মুনাফা স্থানান্তর স্বচ্ছ করা এবং সুশাসন জোরদার করা জরুরি।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ইতোমধ্যে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন, করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার এবং বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা সহায়তা সেল গঠন।
২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম ১৫ দিনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ২০৩ কোটি টাকার বেশি লেনদেন করেছেন, যা আগের ১৫ দিনের ৮৭ কোটি টাকার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশির অংশগ্রহণ ক্রমেই কমছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা মোট ৩২ কোটি ডলার লেনদেন করেছেন।
ডিএসইর তথ্যানুসারে, গত ৯ বছরে বিদেশিদের অংশগ্রহণ এক্সচেঞ্জের মোট লেনদেনে ৩.৮৫ থেকে কমে ১.২২ শতাংশে নেমে গেছে। ২০১৬ সালে তাদের লেনদেন ছিল ৮ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা, যা ৩.৬৮ শতাংশ। ২০১৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে কমে এসেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে এমএসসিআই ফ্রন্টিয়ার মার্কেট সূচকের দীর্ঘমেয়াদি শ্লথগতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকি এবং ভালো শেয়ারের সীমিত সরবরাহ দায়ী।

