গতকাল বুধবার টানা আরেকটি সেশনে বড় পতন দেখল শেয়ারবাজার। নতুন নির্বাচিত সরকারের সম্ভাব্য নীতি ও নিয়ন্ত্রক অবস্থান নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানই বাজারে চাপ বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত মঙ্গলবার শপথ নিয়ে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এখনো পুঁজিবাজার নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেনি। রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা বিভাগের প্রধান আক্রমুল আলম বলেন, স্পষ্ট দিকনির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত অনেক বিনিয়োগকারী অপেক্ষায় আছেন।
তার ভাষ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাজারে যে সক্রিয়তা দেখা গিয়েছিল, সেখানে দ্রুত বাড়তি মুনাফা পাওয়া শেয়ার থেকে অনেকে লাভ তুলে নেন। এতে বাজারে সংশোধন শুরু হয়। বিএনপির বড় জয় ঘোষণার পর ১৫ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী লেনদেন দিনে সূচক ২০০ পয়েন্ট লাফিয়ে ওঠে। অবমূল্যায়িত ব্লু-চিপ শেয়ারে তখন অতিরিক্ত উৎসাহ দেখা যায়। তবে সেই উচ্ছ্বাস বেশিদিন টেকেনি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর শীর্ষ পদে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি ইতোমধ্যে শীর্ষ পদে জায়গা পাওয়ার জন্য তৎপর হয়েছেন বলে বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় ইশতেহারে যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসেবে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগবান্ধব করনীতি প্রণয়নের কথাও বলেছেন। নির্বাচন-পরবর্তী উল্লম্ফনের আগে অনেক শেয়ার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। কিন্তু বুধবার টানা তৃতীয় দিনের মতো বাজার নিম্নমুখী থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএসইসি কর্মকর্তা প্রশ্ন তোলেন, সরকার যদি আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণে ৫০ বিলিয়ন টাকা ব্যয় করতে পারে, তবে তার একটি অংশ বিনিয়োগকারীদের জন্য কেন বরাদ্দ করা যাবে না। তিনি আরও জানান, সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, ঋণগ্রহীতাদের জামানত এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের সম্পদ বিবেচনায় নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। দিনজুড়ে বাজারে অস্থিরতা ছিল। দুর্বল ক্রয়চাপের মধ্যে লাভ তুলে নেওয়ার প্রবণতাই প্রাধান্য পায়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দিন শেষে ৫,৫১৯ পয়েন্টে দাঁড়ায়। আগের দিনের তুলনায় ৫১ পয়েন্ট বা ০.৯২ শতাংশ কমেছে। টানা তিন দিনে সূচক মোট ৮১ পয়েন্ট হারিয়েছে। ব্লু-চিপ শেয়ারেও বড় সংশোধন দেখা যায়। ইসলামী ব্যাংক, ওয়ালটন, স্কয়ার ফার্মা, আইএফআইসি ও বিএটি বাংলাদেশ—এই নির্বাচিত কয়েকটি শেয়ারের দরপতনই সূচক পতনে বড় ভূমিকা রাখে। পাঁচটি শেয়ার মিলেই ডিএসইএক্সে ২৪ পয়েন্ট পতন ঘটায়। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার একাই সূচকে ১৩ পয়েন্ট পতন ঘটায়। দিনে ব্যাংকটির শেয়ারদর কমে ৪.৫ শতাংশ।
ডিএসইর ৩০টি শীর্ষ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস৩০ সূচক ১৬ পয়েন্ট কমে ২,১১০ পয়েন্টে নামে। শরিয়াভিত্তিক কোম্পানির সূচক ডিএসইএস ১২ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ১,১০৫ পয়েন্টে। লেনদেনও তিন সেশন পর ১০ বিলিয়ন টাকার নিচে নেমে আসে। আগের দিনের তুলনায় ২৩ শতাংশ কমে মোট লেনদেন হয় ৯.৩৬ বিলিয়ন টাকা।
খাতভিত্তিক পারফরম্যান্সেও নেতিবাচক চিত্র। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত ২.৫৬ শতাংশ হারিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর খাদ্য, ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ, ওষুধ, প্রকৌশল ও টেলিকম খাতেও পতন দেখা যায়। লেনদেন হওয়া ৩৯৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৮৬টির দর কমে। বাড়ে ৮২টির। অপরিবর্তিত থাকে ২৫টি। সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় স্কয়ার ফার্মার শেয়ার, যার লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৬৫ মিলিয়ন টাকা। এরপর ছিল এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, ঢাকা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই চিত্র। অল শেয়ার প্রাইস ইনডেক্স ৮৪ পয়েন্ট কমে ১৫,৪২৯ পয়েন্টে নামে। সিলেক্টিভ ক্যাটাগরিজ ইনডেক্স ৬২ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৯,৪৬৩ পয়েন্টে। নতুন সরকারের নীতিগত দিকনির্দেশনা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত বাজারে এই অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

