কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে হ্যাকাররা এখন সহজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেনামী অ্যাকাউন্টের পেছনে থাকা প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করতে পারছে—সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন সতর্কবার্তা উঠে এসেছে।
নতুন এই গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির কারণে হ্যাকারদের জন্য বেনামী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়ে গেছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, অধিকাংশ পরীক্ষায় দেখা গেছে, অনলাইনে বেনামী ব্যবহারকারীরা যে তথ্য পোস্ট করেন, সেই তথ্যের ভিত্তিতে অন্য প্ল্যাটফর্মে থাকা তাদের প্রকৃত পরিচয়ের সঙ্গে তা মিলিয়ে দিতে পারছে বৃহৎ ভাষা মডেল বা চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তি নির্ভর সিস্টেমগুলো।
এআই গবেষক সায়মন লারম্যান এবং ড্যানিয়েল পালেকা বলেছেন, বিভিন্ন বৃহৎ ভাষা মডেল এখন উন্নত ধরনের ‘প্রাইভেসি আক্রমণ’ চালানোকে সহজ ও সাশ্রয়ী করে তুলেছে। ফলে অনলাইনে কোন তথ্যকে ব্যক্তিগত বা গোপন বলা যাবে, সে বিষয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
গবেষকরা তাদের পরীক্ষায় কয়েকটি বেনামী অ্যাকাউন্ট এআই ব্যবস্থার কাছে তুলে দিয়ে সেগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের অনুরোধ জানান। তারা একটি কাল্পনিক উদাহরণ দিয়ে দেখান, ধরা যাক একজন ব্যবহারকারী স্কুলে নিজের পড়াশোনার সমস্যার কথা লিখছেন এবং একই সঙ্গে ডলোরেস পার্কে তার ‘বিস্কুট’ নামের কুকুরটিকে নিয়ে হাঁটতে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করছেন।
এই কাল্পনিক ঘটনার ভিত্তিতে এআই তখন ইন্টারনেটের অন্যান্য উৎসে এসব তথ্য খুঁজে দেখে এবং শেষ পর্যন্ত সেই কাল্পনিক নামের অ্যাকাউন্টটির প্রকৃত পরিচয় নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
যদিও উদাহরণটি কাল্পনিক, গবেষণার লেখকরা এমন কিছু বাস্তব পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বেনামীভাবে মত প্রকাশ করা ভিন্নমতাবলম্বী বা অধিকারকর্মীদের ওপর নজরদারি চালাতে পারে। একইভাবে হ্যাকাররা কারও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণার কাজও করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি দ্রুত বাড়ছে, যা কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং গোপনীয়তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই ধরনের নজরদারিতে বৃহৎ ভাষা মডেল ব্যবহার করে অনলাইনে কোনো ব্যক্তির বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে হাতে-কলমে করা প্রায় অসম্ভব।
গবেষক লারম্যান বলেছেন, অনলাইনে সাধারণ মানুষের যেসব তথ্য সহজেই পাওয়া যায় সেগুলো এখন প্রতারণার কাজে সরাসরি অপব্যবহার করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিং আক্রমণ, যেখানে প্রতারক কোনো বিশ্বস্ত বন্ধুর পরিচয়ে ভুক্তভোগীকে তার ইনবক্সে পাঠানো ক্ষতিকর লিংকে ক্লিক করতে প্ররোচিত করে।
বর্তমানে এ ধরনের উন্নত সাইবার আক্রমণ চালাতে আগের মতো বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজনও অনেক কমে গেছে। হ্যাকারদের এখন কেবল একটি ইন্টারনেট সংযোগ এবং সাধারণ ভাষা মডেল ব্যবহারের সুযোগ থাকলেই চলতে পারে।
লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পিটার বেন্টলি সতর্ক করে বলেছেন, যদি বেনামী অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করার বাণিজ্যিক প্রযুক্তি বা পণ্য বাজারে সহজলভ্য হয়ে যায়, তাহলে তা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ বিভিন্ন ভাষা মডেল অনেক সময় ভুলভাবে একাধিক অ্যাকাউন্টকে এক ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত করে ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, “এর ফলে মানুষ এমন কাজের জন্যও অভিযুক্ত হতে পারেন, যা বাস্তবে তিনি করেননি।”
অন্যদিকে এডিনবরার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক অধ্যাপক মার্ক জুয়ারেজ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের অন্যান্য তথ্যও ব্যবহার করতে পারে, যেমন হাসপাতালের নথি, ভর্তির তথ্য কিংবা বিভিন্ন পরিসংখ্যানভিত্তিক উপাত্ত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে পরিচয় গোপন রাখার জন্য যে কঠোর মানদণ্ড প্রয়োজন, এসব তথ্য সেই নিরাপত্তা দিতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।
জুয়ারেজ বলেন, “বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক। এই গবেষণা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে বর্তমান পদ্ধতিগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।”
তবে অনলাইনে পরিচয় গোপন রাখার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো সর্বক্ষমতাসম্পন্ন সমাধান নয়। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন এআই মডেল বেনামী তথ্য থেকে পরিচয় শনাক্ত করতে পারলেও সেখানে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য থাকে না।
আবার অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ফলাফলের সংখ্যা এত বেশি হয়ে যায় যে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

