আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে মেটা ও থাইল্যান্ড পুলিশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে পরিচালিত এসব চক্র দমনে প্ল্যাটফর্ম থেকে দেড় লাখেরও বেশি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছে মেটা।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, মেটা ও থাইল্যান্ডের রয়াল থাই পুলিশের যৌথ উদ্যোগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে।
বুধবার মেটা বলেছে, বিশ্বজুড়ে অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তারা দেড় লাখেরও বেশি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছে। একই অভিযানে থাই পুলিশ ২১ জন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।
থাইল্যান্ডের ‘অ্যান্টি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার’-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই ও মার্কিন বিচার বিভাগের বিশেষ টাস্কফোর্সও সরাসরি অংশ নিয়েছে। মেটার তদন্তকারীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রিয়াল টাইমে এই অপরাধীদের শনাক্ত ও দমনে কাজ করেছে।
অভিযান চালানোর পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার জন্য বেশ কিছু নতুন টুল বা ফিচার চালুর ঘোষণা দিয়েছে মেটা। এখন থেকে ফেইসবুকে কোনো সন্দেহজনক ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসলে ব্যবহারকারীদের সতর্ক করবে প্লাটফর্মটি।
এ ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপে প্রতারণামূলক কোনো ডিভাইসে অ্যাকাউন্ট লিংক করার চেষ্টা করা হলে সেখানেও একটি সতর্কবার্তা বা ওয়ার্নিং সিস্টেম থাকবে।
মেটার নতুন টুলের লক্ষ্য, ফেইসবুক প্রোফাইলের মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করা। যেমন, কোনো প্রোফাইলে যে দেশের কথা উল্লেখ রয়েছে, অ্যাকাউন্টটি যদি আসলে অন্য কোনো দেশ থেকে চালানো হয় তবে টুলটি তা ধরে ফেলবে।
ব্যবহারকারীকে ওই প্রোফাইল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেবে টুলটি। যেমন কোনো কমন ফ্রেন্ড না থাকা বা অ্যাকাউন্টটি একদম নতুন হওয়া। এসব তথ্য দেখে ব্যবহারকারী চাইলে ওই অ্যাকাউন্টটি ব্লক বা ভুয়া হিসেবে রিপোর্ট করতে পারবেন।
মেটার হোয়াটসঅ্যাপ সতর্কবার্তা সিস্টেমটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যাতে প্রতারকরা ব্যবহারকারীদের ফোন নম্বর অন্য কোনো ডিভাইসে যোগ করে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে। এমন চেষ্টা করা হলে ব্যবহারকারীর ফোনে একটি পপ আপ মেসেজ আসবে, যা ব্যবহারকারীকে সতর্ক করে জানাবে, বিষয়টি কোনো প্রতারণা হতে পারে।
এ ছাড়া ফেইসবুক মেসেঞ্জারেও প্রতারণা শনাক্তের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে অপরিচিত কোনো কাজের অফার বা মেসেজ আসলে ব্যবহারকারীরা চাইলে তা এআই দিয়ে যাচাই করিয়ে নিতে পারবেন যে সেটি আসল নাকি ভুয়া।
কর্তৃপক্ষ বলেছে, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও লাওসের মতো দেশগুলো থেকে বর্তমানে শক্তিশালী অনলাইন প্রতারক চক্র গড়ে উঠেছে। তারা এখন অনেক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং বড় আকারের অপরাধমূলক ব্যবসা পরিচালনা করছে, যাতে প্রশাসনের নজরদারি সহজে এড়িয়ে চলা যায়।
এসব প্রতারক চক্র সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিতে তারা এখন বিভিন্ন ভাষায় নিজেদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক এ অভিযানে যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি’ ছাড়াও কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, ফিলিপিন্স ও ইন্দোনেশিয়ার তদন্তকারী সংস্থাগুলো অংশ নিয়েছে।
এর আগে, ডিসেম্বরে একটি পরীক্ষামূলক অভিযানে মেটা প্ল্যাটফর্ম থেকে ৫৯ হাজার অ্যাকাউন্ট, পেইজ ও গ্রুপ মুছে ফেলা এবং ছয় জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। গত সপ্তাহের অভিযানে সেই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি ছাড়িয়েছে।
মেটার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডেপুটি জেনারেল কাউন্সেল ক্রিস সন্ডারবি বলেছেন, “অভিযানটি থেকে প্রমাণ মেলে, তথ্য আদান প্রদান ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অপরাধী চক্রের মূলে আঘাত করে বড় ধরনের অগ্রগতি পাওয়া সম্ভব।”
থাইল্যান্ডের রয়াল থাই পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার জেনারেল জিরাভব ভুরিদেজ বলেছেন, এই সাঁড়াশি অভিযান ‘অপরাধীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে’ যে, সীমান্ত ছাড়িয়ে সক্রিয় থাকা অনলাইন প্রতারক চক্রগুলোকে আইনের আওতায় আনতে কর্তৃপক্ষ তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাবে।

