জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন শেষ হয়েছে, কিন্তু এটি যতটা না উত্তর দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন রেখে গেছে। আর সেই প্রশ্নগুলোর কেন্দ্রে আছে একটি পুরনো অথচ অস্বস্তিকর বিতর্ক—আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কি সত্যিই নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে চলে, নাকি শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রের ইচ্ছাই নির্ধারণ করে বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ?
ট্রাম্পের হুমকি, আর কূটনীতির ভাষার রূপান্তর
২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের মঞ্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে লক্ষ্য করে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা কূটনৈতিক প্রথার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। শান্তি চুক্তি না হলে আরও কঠোর পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি ইরানকে “সম্পূর্ণ ধ্বংস” করার কথাও বলেন। এখানে সরাসরি পারমাণবিক হামলার ঘোষণা ছিল না, কিন্তু একটি রাষ্ট্রপ্রধান যখন জাতিসংঘের মতো কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চ থেকে এমন ভাষা ব্যবহার করেন, তখন প্রশ্ন ওঠে—আন্তর্জাতিক সংলাপের ভাষা আসলে কতটা বদলে গেছে।
শুধু ইরান নয়, কিউবাকেও তিনি “ব্যর্থ রাষ্ট্র” আখ্যা দিয়ে দেশটির শাসনব্যবস্থার পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করেন, যার প্রতিবাদে কিউবার প্রতিনিধিদল অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্য একটি রাষ্ট্রের প্রধান কতটা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে পারেন—এই প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফিলিস্তিন: ভোট আছে, কিন্তু ভিসা নেই
এই অধিবেশনের সবচেয়ে প্রতীকী দ্বন্দ্বটি সম্ভবত ফিলিস্তিনকে ঘিরে। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসসহ শীর্ষ প্রতিনিধিদের যুক্তরাষ্ট্র ভিসা না দেওয়ায় সাধারণ পরিষদকে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়—১৭ সেপ্টেম্বর ১৫২-৩ ভোটে সিদ্ধান্ত হয় যে আব্বাসের বক্তব্য পূর্বধারণকৃত ভিডিওর মাধ্যমে প্রচার করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও প্যারাগুয়ে এর বিপক্ষে ভোট দেয়।
জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে হলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে অবস্থিত, ফলে সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের চলাচলে বাধা না দেওয়ার একটি চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে প্রবেশাধিকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে যায় আয়োজক দেশের হাতেই। প্রায় দুইশ রাষ্ট্র যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে সমান ভোটাধিকার নিয়ে বসে, সেই প্রতিষ্ঠানের দরজায় প্রবেশের বাস্তব ক্ষমতা যদি একটি মাত্র রাষ্ট্রের হাতে থাকে, তাহলে “আন্তর্জাতিক সমতা” ধারণাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়।
একই সময়ে ইরানের ক্ষেত্রেও একধরনের অসামঞ্জস্য দেখা গেছে—প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিকে ভিসা দেওয়া হলেও তাঁদের গণমাধ্যম দলের একাংশকে ভিসা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হিসেবে দাবি করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ঢুকতে পারলেও সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত থাকছে—এই প্রশ্নও উপেক্ষা করার মতো নয়।
গাজা: আলোচনা প্রচুর, পরিবর্তন সামান্য
গাজার মানবিক বিপর্যয় নিয়ে অধিবেশনে আলোচনার অভাব হয়নি। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিজেই গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ ও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিপদ নিয়ে সতর্ক করেছেন, আর আরব-মুসলিম দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিউইয়র্কে বৈঠক করে মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু আসল সংকট আলোচনার অভাবে নয়—বরং আলোচনা, বিবৃতি আর প্রস্তাব যতটা হচ্ছে, বাস্তবে মাটিতে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন ততটা আসছে না। এখানেই আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে গভীর সংকটটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভেনেজুয়েলা: রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সম্পদের নিয়ন্ত্রণ
ভেনেজুয়েলার ঘটনাপ্রবাহও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন সামরিক অভিযানে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন, এবং এরপরই ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি সম্পন্ন হয়, যাতে দেশটির ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত মজুদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ পায়।
তবে এখানে কিছু সংখ্যা নিয়ে স্পষ্টতা জরুরি—এই ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল “বিশ্বের ৬৫ শতাংশ তেল মজুদ” নয়, বরং ভেনেজুয়েলার মোট আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল মজুদের একটি অংশমাত্র। আর “এক মাসে ১০০ বিলিয়ন ব্যারেল তেল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে”—এমন দাবিরও নির্ভরযোগ্য সমর্থন নেই; বরং আলোচনায় এসেছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ-পরিকল্পনার কথা, যা তেল উত্তোলন ও অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সংখ্যার অতিরঞ্জন এড়িয়ে গেলেও মূল প্রশ্নটি একই থেকে যায়– রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিদেশি রাষ্ট্রের এত ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সার্বভৌমত্বের ধারণাকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
তাহলে জাতিসংঘের প্রকৃত ক্ষমতা কতটুকু?
সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রত্যেকের একটি করে ভোট থাকলেও নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দেয়। ফলে একটি প্রস্তাব বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হলেও তার বাস্তবায়নের ক্ষমতা প্রায়ই সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে থাকে না। ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নে ১৫২টি দেশের প্রতিবাদী ভোট প্রমাণ করে যে বিশ্বজনমত একরকম, কিন্তু বাস্তব ক্ষমতার সমীকরণ ভিন্ন পথে চলে—এই ব্যবধানই আজকের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে জাতিসংঘ নিছক বাগাড়ম্বরের মঞ্চ নয়—মানবিক সহায়তা, শরণার্থী সুরক্ষা, শান্তিরক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা এখনো অপরিহার্য। সংকটটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বে নয়, বরং তার ক্ষমতার কাঠামোতে—যেখানে বৃহৎ শক্তির ইচ্ছার সামনে সম্মিলিত বিশ্বজনমতও প্রায়ই অসহায় হয়ে পড়ে।
৮১তম অধিবেশন তাই একটি পুরনো প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে এনেছে। “আমরা জনগণ”-এর নামে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা যদি শেষ পর্যন্ত “আমরা শক্তিশালীরা”-র সিদ্ধান্তের কাছেই নতজানু থাকে, তাহলে প্রশ্নটি জাতিসংঘের অস্তিত্ব নিয়ে নয় বরঞ্চ তার আত্মপরিচয় নিয়ে। শক্তির সামনে আইন যেখানে বারবার থেমে যায়, সেখানে জাতিসংঘ আসলে কতটা জাতিসংঘ, আর কতটা শক্তিশালীদের সম্মেলনকক্ষ মাত্র?

