পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ অলিগলি, আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে রাসায়নিকের গুদাম—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ অগ্নিঝুঁকির বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একের পর এক অগ্নিকাণ্ড প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি ডেকে আনছে।
প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত, সুপারিশ, সতর্কবার্তা ও উচ্ছেদের ঘোষণা এলেও ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম সরানো এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই। প্রশ্ন হলো, বিপদের পূর্বাভাস থাকার পরও কেন পুরান ঢাকার মানুষকে বারবার আগুনের আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে?
দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্ত হয়—তারপর?
২০১০ সালের নিমতলী ট্র্যাজেডিতে ১২৪ জনের মৃত্যু, ২০১৯ সালের চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জনের প্রাণহানি এবং ২০২১ সালে আরমানিটোলার অগ্নিকাণ্ড—এসব ঘটনা বাংলাদেশের নগর নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কসংকেত ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের বঙ্গবাজারের আগুনও দেখিয়েছে, ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
কিন্তু এতগুলো বিপর্যয়ের পরও মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধান হয়নি:
- আবাসিক ভবনে বিপজ্জনক রাসায়নিক মজুত বন্ধ করা গেল না কেন?
- ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও গুদামের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন?
- তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার—তা কি এখনো স্পষ্ট নয়?
প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আহাজারি শোনা যায়, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হয়, তদন্তের প্রতিশ্রুতি আসে। কিন্তু কিছুদিন পরই পুরোনো বাস্তবতা ফিরে আসে। এভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার বদলে আমরা যেন দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর একটি চক্রে আটকে আছি।
আবাসিক ভবনে রাসায়নিকের মজুত, বিপদে সাধারণ মানুষ
পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রাসায়নিক, প্লাস্টিকের কাঁচামাল, প্রসাধনী ও দাহ্য পদার্থের গুদাম রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো আবাসিক ভবন কিংবা জনবহুল বাণিজ্যিক এলাকার মধ্যে অবস্থিত। ফলে কোনো একটি গুদামে আগুন লাগলে তা দ্রুত পাশের দোকান, ভবন ও বসতবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
রাসায়নিকের ধরন অনুযায়ী আগুনের তীব্রতা, ধোঁয়ার বিষাক্ততা ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অথচ পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, নিরাপদ সংরক্ষণব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং জরুরি নির্গমনপথ না থাকলে একটি ছোট দুর্ঘটনাও বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
| বিপদের পূর্বাভাস থাকার পরও কেন পুরান ঢাকার মানুষকে বারবার আগুনের আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে? |
এখানে ব্যবসায়ীদের জীবিকা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ আশপাশের বাসিন্দাদের জীবন ও নিরাপত্তা। নিরাপদ ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব; কিন্তু জনবসতির মধ্যে বিপজ্জনক রাসায়নিকের অনিরাপদ মজুতকে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
আগুন নেভাতে গিয়ে বাধা: সরু রাস্তা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ
পুরান ঢাকার অনেক গলি এতটাই সরু যে বড় অগ্নিনির্বাপণ যানবাহন নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। রাস্তার দুই পাশে দোকান, পণ্যবাহী যান, অবৈধ পার্কিং এবং মানুষের ভিড় উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তোলে। কোথাও পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, কোথাও ভবনের ভেতরে আগুন মোকাবিলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম অপ্রতুল।
আগুন লাগার প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে অনেক ক্ষেত্রে আগুনের বিস্তার সীমিত রাখা সম্ভব। কিন্তু উদ্ধারকারী দল যদি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেই দীর্ঘ সময় ব্যয় করে, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ সমস্যা শুধু ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। নগর পরিকল্পনা, সড়ক ব্যবস্থাপনা, ভবন নির্মাণের অনুমোদন, গুদামের অবস্থান নির্ধারণ এবং নিয়মিত তদারকির সঙ্গে এর সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
নোটিশই কি দায়িত্ব পালনের শেষ ধাপ?
অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি শনাক্ত করে নোটিশ দেওয়া প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ। কিন্তু নোটিশ জারির পরও যদি ঝুঁকি দূর না হয়, তাহলে সেই পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
কোনো ভবন বা গুদাম বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে আইন অনুযায়ী জরিমানা, কার্যক্রম বন্ধ কিংবা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উচ্ছেদের ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ বিকল্প স্থান নিশ্চিত করার উদ্যোগও জরুরি।
শুধু ভবনমালিক বা ব্যবসায়ীর দায় নির্ধারণ করলেই হবে না। সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদন, পরিদর্শন, লাইসেন্স প্রদান এবং তদারকির প্রক্রিয়াও স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চলতে থাকলে কোথায় নজরদারির ঘাটতি ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সমাধান শুধু উচ্ছেদ নয়, পরিকল্পিত পুনর্বাসনও
পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম সরানোর আলোচনা বহুদিনের। কিন্তু বিকল্প জায়গা, পরিবহনব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে শুধু উচ্ছেদের ঘোষণা দিলে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। এ জন্য কিছু পদক্ষেপ জরুরি:
- ঝুঁকির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ: রাসায়নিক গুদাম, কারখানা ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে অবস্থান, লাইসেন্স, সংরক্ষিত পদার্থের ধরন এবং অগ্নিনিরাপত্তার অবস্থা অনুযায়ী একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করতে হবে।
- নিরাপদ রাসায়নিক শিল্পাঞ্চল: প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রশস্ত সড়ক ও জরুরি সেবার সুবিধাসহ নির্ধারিত এলাকায় রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে।
- সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন: কোন সংস্থা কখন কী ব্যবস্থা নেবে, তা নির্দিষ্ট করতে হবে। অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে এবং ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
- জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা উন্নত করা: অগ্নিনির্বাপণ যানবাহনের প্রবেশপথ সচল রাখা, পর্যাপ্ত পানির উৎস নিশ্চিত করা, বৈদ্যুতিক তারের ঝুঁকি কমানো এবং ভবনভিত্তিক অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
- ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ: ব্যবসায়ী সংগঠন, স্থানীয় বাসিন্দা, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, রাজউক ও প্রশাসনের সমন্বয়ে কার্যকর তদারকি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
আরেকটি ট্র্যাজেডির জন্য অপেক্ষা কেন?
পুরান ঢাকার অগ্নিঝুঁকি কোনো আকস্মিক সমস্যা নয়। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিপজ্জনক পদার্থের অনিরাপদ সংরক্ষণ, দুর্বল তদারকি এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ঘাটতি মিলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এখানে প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। একটি ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম, একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া গলিপথ কিংবা অগ্নিনিরাপত্তাহীন একটি ভবন বহু মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে। তাই পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠনের অপেক্ষায় না থেকে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সরকার, সিটি করপোরেশন, রাজউক, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে নাগরিকদের প্রত্যাশা স্পষ্ট—ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন; নোটিশ নয়, কার্যকর ব্যবস্থা; দুর্ঘটনার পর শোক নয়, দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধ।
*পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করতে আরেকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন*।

