Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice সোম, নভে. 2, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • জলবায়ু ও পরিবেশ
      • লাইফস্টাইল
      • বিশ্লেষণ
      • কৃষি
      • রাজনীতি
      • ভিডিও
      • বিশেষ বিশ্লেষণ
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » মণিপুরে এত রক্তপাতের পরও শান্তি ফিরছে না কেন?
    আন্তর্জাতিক

    মণিপুরে এত রক্তপাতের পরও শান্তি ফিরছে না কেন?

    এফ. আর. ইমরাননভেম্বর 2, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    মণিপুরে শনিবারের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে জাতিগত সংঘাত চলছে। মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যকার বিরোধের রক্তক্ষরণ এখনো বন্ধ হয়নি। এর মধ্যে কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ১ নভেম্বর দুই পৃথক ঘটনায় পাঁচ কুকি সদস্য নিহত হওয়ার খবর এসেছে। অন্যদিকে, কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরকারের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের দাবিতে মেইতেই ও নাগা সংগঠনগুলোর বিক্ষোভ নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে। জাতিগত বিভাজন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, মিয়ানমারের অস্থিতিশীল সীমান্ত এবং রাজনৈতিক সমাধানের অভাব মিলিয়ে মণিপুর এখন ভারতের জন্য বড় নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট। প্রশ্ন হচ্ছে, এত অভিযান, রাষ্ট্রপতি শাসন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও কেন শান্তি ফিরছে না মণিপুরে?

    ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের একটি মণিপুর। আয়তনে ছোট হলেও কৌশলগতভাবে রাজ্যটির গুরুত্ব অনেক। একদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রায় ৩৯৮ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্ত, অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় মণিপুর গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিনের জাতিগত, রাজনৈতিক ও ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ এখন রাজ্যটির অভ্যন্তরীণ সংকট ছাড়িয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।

    সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তারই উদাহরণ। ১ নভেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের দিন নোনে জেলায় অজ্ঞাত সশস্ত্র ব্যক্তিদের মধ্যে গোলাগুলিতে তিন কুকি পুরুষ নিহত হন। একই দিন কাংপোকপি জেলা থেকে আরও দুই কুকি যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে নিরাপত্তা বাহিনী। নিহত দুজন হলেন পাওগিনলাল হাংশিং (২০) ও টিঙ্গিনলুন চংলোই (২১)। তাঁরা ২৮ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তাঁদের সন্ধানে মণিপুর পুলিশ, সিআরপিএফ ও আসাম রাইফেলসসহ বিভিন্ন বাহিনী অভিযান চালায়।

    মণিপুরে শনিবারের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

    দুই যুবকের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে কুকি-জো সংগঠন কমিটি অন ট্রাইবাল ইউনিটি (কোটু) কাংপোকপি জেলায় অনির্দিষ্টকালের বন্ধ ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে, কুকিদের একটি সংগঠন এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে অপরাধীদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এই অভিযোগকে এখনই প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

    এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার কোনো রাজনৈতিক দল বা সশস্ত্র সংগঠন নয়, সাধারণ মানুষ। তাঁদের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, আর কত দিন বাড়িঘর ছেড়ে থাকতে হবে? আর কত প্রাণ গেলে সংঘাত থামবে? কবে তাঁরা আবার নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন?

    সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মণিপুরের সংঘাত এখন আর শুধু মেইতেই ও কুকি-জোদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কুকি ও নাগাদের মধ্যেও নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একজন নাগা ব্যক্তিকে কুকি সম্প্রদায়ের কয়েকজনের হাতে নির্যাতনের অভিযোগের পর উত্তেজনা বাড়ে। মে মাসে তিন কুকি যাজক নিহত হওয়ার ঘটনায় নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এরপর পাল্টাপাল্টি অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ, পুরোনো সংঘাতের ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন জাতিগত বিরোধ তৈরি হচ্ছে।

    মেইতেই ও কুকি-জোদের শত্রুতা: বিরোধের শিকড় কোথায়?

    মণিপুরের বর্তমান সংকট বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক পটভূমি দেখতে হবে। রাজ্যটির সামাজিক কাঠামো মূলত উপত্যকা ও পাহাড়ি অঞ্চলে বিভক্ত। মেইতেই জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ ইম্ফল উপত্যকায় বসবাস করেন। অন্যদিকে কুকি-জো ও নাগা জনগোষ্ঠীর বসতি প্রধানত পাহাড়ি এলাকায়। মেইতেইদের অধিকাংশ হিন্দু হলেও তাঁদের মধ্যে সনামাহি ধর্মাবলম্বী মানুষও রয়েছেন। কুকি-জো ও নাগাদের বড় অংশ খ্রিস্টান। তবে এই সংঘাতকে শুধু ধর্মীয় বিরোধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মূল কারণ ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।

    ২০২৩ সালের সংঘাতের তাৎক্ষণিক সূত্রপাত হয় মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি বা Scheduled Tribe (ST) মর্যাদা দেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে। ২৭ মার্চ ২০২৩ মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে এ বিষয়ে কেন্দ্রের কাছে সুপারিশ করার প্রক্রিয়া বিবেচনার নির্দেশ দেয়। এর প্রতিবাদে ৩ মে অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের উদ্যোগে আদিবাসী সংহতি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সেই মিছিলকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং হত্যাকাণ্ড ঘটে।

    ২০২৬ সালের ৩১শে অক্টোবর ইম্ফলে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী এসওও চুক্তি নবায়ন না করা, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং উপ-মুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপগেনের অপসারণের দাবিতে একটি র‍্যালিতে যোগ দেন। ছবি: সংগৃহীত

    মেইতেইদের একটি অংশ মনে করে, উপত্যকার সীমিত ভূমি, জনসংখ্যার চাপ এবং মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশের আশঙ্কার কারণে তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ভূমির অধিকার সুরক্ষায় বিশেষ সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রয়োজন। অন্যদিকে কুকি-জোদের আশঙ্কা, মেইতেইদের তফসিলি উপজাতির মর্যাদা দেওয়া হলে পাহাড়ি অঞ্চলে তাদের ভূমির অধিকার ও রাজনৈতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

    এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বনভূমি উচ্ছেদ ও মাদকবিরোধী অভিযান। কুকি-জোদের একাংশ মনে করে, এসব পদক্ষেপ তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি ও অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে প্রশাসনের যুক্তি, সংরক্ষিত বনভূমি দখল ও অবৈধ মাদক চাষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা প্রয়োজন। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও জাতিগত অবিশ্বাসের মধ্যে নতুন বিরোধ তৈরি করেছে।

    মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ মণিপুরের সংকটকে কীভাবে জটিল করছে?

    মণিপুরের সংকটকে শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ জাতিগত বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে চলমান গৃহযুদ্ধ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তাকে আরও জটিল করেছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের চিন ও সাগাইং অঞ্চলে সামরিক জান্তা, জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং প্রতিরোধ বাহিনীর সংঘর্ষের প্রভাব সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলোতে পড়ছে।

    মিয়ানমারের চিন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে ভারতের কুকি-জো জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সীমান্তের ওপারে সংঘাত বাড়লে শরণার্থী প্রবেশ, অবৈধ চলাচল এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত হওয়ায় এসব এলাকার ওপর নিয়মিত নজরদারি করাও কঠিন।

    জান্তার হামলায় মিয়ানমারে ১২ জনের মৃত্যু
    জান্তার হামলায় মিয়ানমারে নাজেহাল অবস্থা। চলছে গৃহযুদ্ধ। ছবি: সংগৃহীত

    এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদক পাচার ও অস্ত্র চোরাচালান। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা UNODC-এর গবেষণায় মিয়ানমার থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মেথামফেটামিন পাচারের বিস্তারের কথা উঠে এসেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোরে-তামু সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে আসা ৪ হাজার ৬২৬ কেজি অ্যামফেটামিনজাতীয় মাদক এবং ২ হাজার ৬৫২ কেজি হেরোইন জব্দ করা হয়েছে।

    মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের মধ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে আধুনিক অস্ত্রের প্রবাহও বেড়েছে। সীমান্তের দুর্গম পথ ব্যবহার করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে এসব পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে মণিপুরের প্রতিটি জাতিগত সংঘর্ষের সরাসরি যোগসূত্র প্রমাণিত নয়। তবু মাদক, অস্ত্র, সীমান্তপারের অপরাধ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি একই অঞ্চলে সক্রিয় থাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

    যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংঘাত

    মণিপুরের সাম্প্রতিক উত্তেজনার আরেকটি বড় কারণ কুকি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে ভারত সরকারের Suspension of Operations বা SoO চুক্তি। ২০০৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকার, মণিপুর সরকার এবং কুকি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র সংঘর্ষ কমানো, নির্ধারিত ক্যাম্পে যোদ্ধাদের অবস্থান নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা।

    কিন্তু ২০২৩ সালের মে মাসে মেইতেই-কুকি সংঘাত শুরু হওয়ার পর চুক্তিটি নিয়ে বিরোধ বাড়ে। মেইতেই সংগঠনগুলোর অভিযোগ, চুক্তির আওতায় থাকা কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী সহিংসতায় জড়িত থেকেও কার্যকর জবাবদিহির বাইরে রয়েছে। কুকি-জো সংগঠনগুলো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

    আপনার দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এক বছরের জন্য নবায়ন করা হয়েছিল এবং ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এর মেয়াদ শেষ হয়। পরে তা আর নবায়ন করা হয়নি বলে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

    এই প্রেক্ষাপটে ৩১ অক্টোবর ইম্ফলে বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। মণিপুর অখণ্ডতা সমন্বয় কমিটি (COCOMI), বিভিন্ন নাগা সংগঠন এবং অন্যান্য সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত মিছিলে মেইতেই, নাগা ও মেইতেই পাঙ্গাল সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নেন। তাঁদের দাবি ছিল, SoO ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বাতিল, নির্ধারিত সশস্ত্র ক্যাম্প বন্ধ, অস্ত্র যাচাই, সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে আসাম রাইফেলস প্রত্যাহার এবং বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়া। উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপগেনকে অপসারণের দাবিও তোলা হয়।

    বিক্ষোভ শুধু ইম্ফলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেনাপতি ও চান্দেলসহ নাগা-অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকাতেও আন্দোলন হয়েছে। অর্থাৎ, মণিপুরের সংকট এখন নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা, যুদ্ধবিরতি চুক্তি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও রাজ্যের অখণ্ডতা নিয়ে বৃহত্তর বিরোধে রূপ নিয়েছে।

    ছবি: এআই সংগৃহীত

    তবে বিক্ষোভকারীদের দাবিই সব সম্প্রদায়ের অভিন্ন অবস্থান নয়। কুকি-জোদের একাংশের কাছে SoO চুক্তি রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাঁদের আশঙ্কা, চুক্তি পুরোপুরি বাতিল হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের সামনে কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে মেইতেই ও নাগা সংগঠনগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ, অন্যদিকে কুকি-জোদের রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তার দাবি—দুটিই বিবেচনায় নিতে হবে।

    মানবিক বিপর্যয়: ঘরে ফেরার নিরাপত্তা কোথায়?

    মণিপুরের সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ২০২৩ সালের মে মাসে সংঘাত শুরু হওয়ার পর হাজার হাজার বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু পরিবার নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্য এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মেইতেই ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর মানুষ কার্যত আলাদা এলাকায় বসবাস করতে শুরু করেছেন।

    ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্য বিধানসভায় দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে থেকে ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সংঘাতে অন্তত ৩০৬ জন নিহত এবং ৪৯ জন নিখোঁজ ছিলেন। সংঘাতের কারণে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩৬ হাজার মানুষকে পুনর্বাসিত করা সম্ভব হলেও ২৪ হাজার মানুষ তখনো ত্রাণশিবিরে বসবাস করছিলেন।

    এই সংখ্যার পেছনে রয়েছে হাজার হাজার পরিবারের ভাঙা জীবন। যেসব শিশু দীর্ঘদিন স্কুলের বাইরে, যেসব নারী পরিবার হারিয়ে আশ্রয়শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন এবং যেসব বৃদ্ধ মানুষ নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না, তাঁদের দুর্ভোগ কোনো পরিসংখ্যানে পুরোপুরি প্রকাশ পায় না।

    মানবাধিকার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সহিংসতার সময় নারী নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ এবং ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার অভিযোগ উঠেছে। দুই নারীকে বিবস্ত্র করে প্রকাশ্যে ঘোরানোর ভিডিও প্রকাশের পর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। আদালত ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং অপরাধীদের বিচারের ওপর গুরুত্ব দেয়।

    এখন প্রশ্ন হলো, মানুষকে শুধু ত্রাণশিবির থেকে সরিয়ে দিলেই কি পুনর্বাসন সম্পন্ন হবে? তাঁদের বাড়িতে ফেরার নিরাপত্তা, জীবিকা, সন্তানদের শিক্ষা এবং অপরাধীদের বিচারের নিশ্চয়তা না থাকলে স্বাভাবিক জীবন ফিরবে কীভাবে?

    মোদি সরকারের সামনে কঠিন পরীক্ষা

    মণিপুরের সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার সহিংসতা মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগের মুখে পড়ে। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। প্রায় এক বছর পর ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি শাসন প্রত্যাহার করে বিজেপি নেতা ইয়ুমনাম খেমচাঁদ সিং নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

    কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তন ও কেন্দ্রীয় শাসনেও জাতিগত অবিশ্বাসের অবসান হয়নি। বরং নতুন করে কুকি-নাগা সংঘাত এবং SoO চুক্তি নিয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক সমঝোতা এখনো কতটা দুর্বল।

    ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: সংগৃহীত

    সমাধানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন সব সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক সংলাপ। শুধু সশস্ত্র সংগঠন নয়, নির্বাচিত প্রতিনিধি, নাগরিক সংগঠন, নারী প্রতিনিধি এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের কথাও শুনতে হবে। মেইতেইদের ভূমি ও নিরাপত্তার উদ্বেগের পাশাপাশি কুকি-জো ও নাগাদের ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিও বিবেচনায় নিতে হবে।

    একই সঙ্গে সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সমানভাবে আইন প্রয়োগ, অস্ত্রের হিসাব ও ক্যাম্পের তদারকি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। মিয়ানমার সীমান্তে মাদক ও অস্ত্র পাচার বন্ধে নজরদারি বাড়াতে হবে। আর সবচেয়ে জরুরি, বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিরাপদে নিজ এলাকায় ফিরিয়ে নেওয়া এবং হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করা।

    মণিপুরের সংকট ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জাতীয় অখণ্ডতা ও ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির জন্যও বড় পরীক্ষা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। কিন্তু জাতিগত সংঘাত চলতে থাকলে বিনিয়োগ, সীমান্ত বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হবে।

    সব মিলিয়ে মণিপুরের সংকট এখন আর শুধু মেইতেই ও কুকি-জোদের বিরোধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কুকি-নাগা সংঘাত, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, মাদক ও অস্ত্র পাচার, নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

    মণিপুরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, বন্দুকের নল দিয়ে কোনো রাজ্যে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অবিশ্বাস দূর করা যায় না। নরেন্দ্র মোদি সরকারের সামনে এখন প্রশ্ন, তারা কি শুধু নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইবে, নাকি সব সম্প্রদায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করবে?

    কারণ এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার কোনো রাজনৈতিক দল বা সশস্ত্র সংগঠন নয়, সাধারণ মানুষ। তাঁদের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, আর কত দিন বাড়িঘর ছেড়ে থাকতে হবে? আর কত প্রাণ গেলে সংঘাত থামবে? কবে তাঁরা আবার নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন?


    তথ্যসূত্র: রয়টার্স (১ নভেম্বর ২০২৬), মণিপুর বিধানসভার সরকারি পরিসংখ্যান, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, UNODC এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ।

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    আন্তর্জাতিক

    যাদের ‘ভেতরের শত্রু’ বলা হয়, ইসরায়েলের ক্ষমতার চাবি এখন তাদের হাতে?

    নভেম্বর 2, 2026
    সম্পাদকীয়

    সাংবাদিকের কলমে কেন এত ভয়?

    নভেম্বর 2, 2026
    বিশ্ব অর্থনীতি

    ডলারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে যেভাবে এগোচ্ছে চীন

    নভেম্বর 2, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.