বিশ্বকে শুল্কের হুমকি, মিত্রদের ওপর চাপ এবং সামরিক শক্তির প্রদর্শন দেখিয়ে গত দুই বছর নিজের মতো করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তিনিই এবার নিজের দেশেই বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খেলেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে শুধু প্রতিনিধি পরিষদ নয়, সিনেটের নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছে তাঁর রিপাবলিকান পার্টি।
টেক্সাস, আইওয়া, কানসাস, ওহাইও, মেইন ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও ডেমোক্র্যাটদের জয় এসেছে। এখন ট্রাম্পের সামনে একদিকে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেস, অন্যদিকে নিজের দলের ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। তবে হোয়াইট হাউস ছাড়তে হচ্ছে না তাঁকে। বরং তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটদের পছন্দের আইন তাঁর পছন্দ না হলে ভেটো দেবেন। তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের সরাসরি ক্ষমতার লড়াই?
আর এই পরাজয় কি ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগেই ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (MAGA) রাজনীতির ভিত কাঁপিয়ে দিল?
যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় এক মোড় তৈরি করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও রয়টার্সের ৪ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট – দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। ফলে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসনামলে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে যাবে।

এই ফলকে শুধু একটি দলের নির্বাচনী জয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ভোটাররা একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর আরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পক্ষেও রায় দিয়েছেন। এপি ভোটার পোলের তথ্য অনুযায়ী, অনেক ভোটারই কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্টের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিতে চেয়েছেন।
রিপাবলিকানদের ঘাঁটিতেই নীল ঝড়
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হলো, ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য শুধু নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া বা প্রচলিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা এমন কিছু এলাকায় জয় পেয়েছে, যেখানে দুই বছর আগে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জিতেছিলেন।
টেক্সাসের কথাই ধরা যাক। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকো রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন। প্রায় ৩৮ বছর পর টেক্সাস থেকে একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা এটি। শুধু সিনেট নয়, গভর্নর নির্বাচনেও বড় অঘটন ঘটেছে। রিপাবলিকান গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে জিনা হিনোজোসা টেক্সাসের প্রথম লাতিনা গভর্নর হওয়ার পথে। ১৯৯৪ সালের পর এই প্রথম একজন ডেমোক্র্যাট টেক্সাসের গভর্নর হচ্ছেন।
আরও বড় ধাক্কা এসেছে কানসাসে। প্রায় এক শতাব্দী পর সেখানে সিনেট আসনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন। আইওয়ায় জশ টুরেক রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন। ওহাইওতে শেরড ব্রাউন এবং মেইনে ট্রয় জ্যাকসনের জয়ও রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা। সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজের জয় তো এই নির্বাচনের অন্যতম বিস্ময়।
এপি জানিয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা অন্তত সাতটি সিনেট আসন রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদেও দুই ডজনের বেশি আসনে দলটি জয় পেয়েছে। এর মধ্যে এমন নির্বাচনী এলাকাও রয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালে ট্রাম্প দুই অঙ্কের ব্যবধানে জিতেছিলেন।
এই ফলের আরেকটি রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী জোটে তরুণ ও হিস্পানিক ভোটারদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যুক্ত হয়েছিল। এবার তাদের মধ্যে সমর্থন কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এপি জানিয়েছে, হিস্পানিক ও তরুণ ভোটারদের সরে যাওয়া রিপাবলিকানদের সম্প্রসারিত ভোটভিত্তিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
ভোটারদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ট্রাম্প
কেন এমন ফল হলো? এর উত্তর খুঁজতে হলে মার্কিনিদের পকেটের হিসাব, ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির দিকে তাকাতে হবে।
রয়টার্সের ৩ নভেম্বরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভোটারদের বড় অংশ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তুষ্ট। প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয়কে গুরুত্বপূর্ণ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। দুই-তৃতীয়াংশের মতো ভোটার উচ্চমূল্যের জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, কংগ্রেসের উচিত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
সিবিএসের বুথফেরত জরিপেও ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ছিল মাত্র ৩৮ শতাংশ। জরিপে দেখা গেছে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার অসন্তুষ্ট। অর্থনীতি নিয়ে তাঁদের নেতিবাচক মনোভাবও ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে।
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার সময় মূল্যস্ফীতি কমানো, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু শুল্কনীতি ও ইরান যুদ্ধের কারণে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কের চাপ, জ্বালানি ব্যয় এবং যুদ্ধের খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, সেটিই ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এখানে ইরান যুদ্ধের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য যত বড়ই হোক, তার অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে মার্কিনিদের উদ্বেগ বেড়েছে। জ্বালানির দাম, সরকারি ব্যয় এবং দীর্ঘ সংঘাতের সম্ভাব্য খরচ ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণার অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।
তবে ভোটারদের অসন্তোষের সবটাই ইরান যুদ্ধের কারণে, এমন দাবি করা যাবে না। জীবনযাত্রার ব্যয়, শুল্ক, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসননীতি ও সরকারি দুর্নীতি মিলিয়েই রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর বিষয় হলো, তিনি নির্বাচনের প্রচারণায় নিজেকেই ভোটের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। এখন ফল খারাপ হওয়ার পর সেটিকে নিজের বিরুদ্ধে গণভোট হিসেবে মানতে নারাজ।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প, কংগ্রেসে বিরোধীরা
নির্বাচনের ফলের পর ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাধা তৈরি হয়েছে কংগ্রেসে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হাতে ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন, সরকারি ব্যয় এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা অপরিহার্য।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট – দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় এখন ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়নের কর্মসূচি আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নিলে হাকিম জেফ্রিস প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হওয়ার পথে। অন্যদিকে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর অর্থ, ট্রাম্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁর মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, বিচারপতি মনোনয়ন এবং বাজেটসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোও নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়বে। সিনেটে রিপাবলিকানরা এত দিন যেসব বিচারিক ও প্রশাসনিক নিয়োগ দ্রুত অনুমোদন করিয়ে নিয়েছে, সেই সুবিধা আর থাকবে না।
এ ছাড়া প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটি ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করতে পারবে। অভিবাসন দমন অভিযান, সরকারি অর্থের ব্যবহার, শুল্কনীতি, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং প্রশাসনের সম্ভাব্য অনিয়ম নিয়ে শুনানিও হতে পারে। হাউস ওভারসাইট কমিটির সম্ভাব্য নেতৃত্বও ইতিমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে বলেই ট্রাম্পের সব সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে না। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। তিনি কোনো বিলের বিরুদ্ধে ভেটো দিতে পারবেন। আর তাঁর ভেটো অতিক্রম করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু আসনবিন্যাসে ডেমোক্র্যাটদের সেই মাত্রা অর্জন করা কঠিন।

ভেটোর হুমকি, ট্রাম্প কোন পথে হাঁটবেন?
নির্বাচনের পর ফক্স নিউজের ব্রেট বেয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটরা তাঁর অপছন্দের কোনো আইন পাঠালে তিনি ভেটো দেবেন।
তাঁর বক্তব্য, ডেমোক্র্যাটরা প্রথমে নানা প্রস্তাব নিয়ে আসবে, তিনি সেগুলো আটকে দেবেন; পরে দুই পক্ষকে আলোচনায় বসতে হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ডেমোক্র্যাট নেতাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
এ বক্তব্যের মধ্যে দুটি বার্তা রয়েছে। প্রথমত, ট্রাম্প কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নন। দ্বিতীয়ত, তিনি শুরু থেকেই ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সংঘাতের পাশাপাশি দর-কষাকষির দরজাও খোলা রাখতে চাইছেন।
এখানে ট্রাম্পের জন্য একটি কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিলে ভেটো দিলে সরকার পরিচালনায় অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। বাজেট পাস, সরকারি কার্যক্রমের অর্থায়ন, সীমান্ত নিরাপত্তা কিংবা নতুন অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে দুই পক্ষকে সমঝোতায় আসতে হবে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনের পর নিজেদের বিজয়কে শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখছে না। হাকিম জেফ্রিস বলেছেন, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সাশ্রয়ী করার জন্য লড়বেন এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটাতে চান।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও ডেমোক্র্যাটদের সতর্ক করে বলেছেন, এই বিজয়কে ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরির কাজে ব্যবহার করতে হবে। শুধু ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানে আটকে থাকলে চলবে না; সাধারণ মানুষের সমস্যার বাস্তব সমাধান দিতে হবে।
তাই ওয়াশিংটনে সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, সেটি হতে পারে একদিকে তদন্ত ও রাজনৈতিক সংঘাত, অন্যদিকে বাজেট ও আইন নিয়ে কঠিন দর-কষাকষির সময়।
MAGA শিবিরে ফাটল, ট্রাম্পের পর কে?
এই নির্বাচনের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হয়তো রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই দেখা যাবে। কারণ, ট্রাম্পের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা MAGA আন্দোলন শুধু একটি নির্বাচনী স্লোগান নয়; এটি রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক পরিচয়, নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
কিন্তু নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর দলের মধ্যপন্থী অংশ প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে- ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল ধরে রেখে ২০২৮ সালে হোয়াইট হাউস পুনরুদ্ধার করা কতটা সম্ভব?

‘আওয়ার রিপাবলিকান লিগ্যাসি’ নামে মধ্যপন্থী রিপাবলিকান গোষ্ঠী বলেছে, দলকে ট্রাম্পের MAGA পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ঐতিহ্যগত রিপাবলিকান মূল্যবোধ ও নতুন নেতৃত্বের সন্ধান করতে হবে। তাদের বক্তব্য, ২০২৮ সালের নির্বাচনে জিততে হলে ট্রাম্প-পরবর্তী রাজনৈতিক যুগ নিয়ে এখনই আলোচনা শুরু করা জরুরি।
এটি রিপাবলিকানদের জন্য সাধারণ নির্বাচনী পরাজয়ের চেয়ে বড় সংকেত। কারণ, দলের ভেতরে যদি ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হয়, তাহলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের সময় বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।
তবে MAGA আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে, এমনটা নয়। ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠী এখনো রিপাবলিকান রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তাঁর সমর্থন ছাড়া দলের অনেক প্রার্থীর মনোনয়ন পাওয়া কঠিন হতে পারে। ফলে দলটির মধ্যপন্থীরা নতুন নেতৃত্ব চাইলে তাঁদের ট্রাম্পের ভোটভিত্তির বিকল্পও তৈরি করতে হবে।
আরেকটি বিষয় হলো, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় মানেই তাঁদের রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন নয়। দলের প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী অংশের মধ্যে করনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে। মিশিগানে আব্দুল এল-সায়েদের জয় প্রগতিশীলদের শক্তি বাড়িয়েছে। আবার অন্য অনেক অঙ্গরাজ্যে মধ্যপন্থী প্রার্থীরাও সফল হয়েছেন।
ফলে ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন নিজেদের বিজয়কে কার্যকর শাসন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপান্তর করার পরীক্ষা।
বিশ্বরাজনীতিতে কী বদলাবে?
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ক্ষমতার এই পরিবর্তন শুধু ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, ইউক্রেন, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ওপরও।
প্রথমেই আসে ইরান যুদ্ধের প্রশ্ন। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেসে সামরিক ব্যয়, যুদ্ধের অর্থায়ন এবং প্রেসিডেন্টের সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর প্রশ্ন উঠতে পারে। নতুন সামরিক অভিযানের জন্য অর্থ বরাদ্দ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ব্যয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হবে। তবে প্রেসিডেন্টের সামরিক কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে সাংবিধানিক ক্ষমতা বহাল থাকবে। তাই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলেই ইরান যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের একটি বড় অংশ ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সহায়তা কমাতে চায়, তাহলে কংগ্রেসে বাধার মুখে পড়তে পারে।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কেও নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা তদন্ত ও অর্থনৈতিক মূল্যায়নের দাবি তুলতে পারেন। বিশেষ করে মার্কিন কৃষক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের ওপর শুল্কের প্রভাব নিয়ে চাপ বাড়বে।
তবে আন্তর্জাতিক নীতিতে সবকিছু রাতারাতি বদলে যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি শুধু প্রেসিডেন্টের ইচ্ছায় পরিচালিত হয় না; কংগ্রেস, প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান, পররাষ্ট্র দপ্তর, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
সুতরাং, ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়লেও তাঁর পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি সিদ্ধান্ত উল্টে দেওয়া ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সহজ হবে না। বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও বেশি দর-কষাকষি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের মধ্য দিয়ে এগোতে পারে।
২০২৮-এর যুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেল?
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক সম্ভবত আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ২০২৮ সালে হোয়াইট হাউসের লড়াইয়ের আগে ডেমোক্র্যাটরা এখন কংগ্রেসে নিজেদের শক্তি প্রমাণের সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের সামনে প্রশ্ন- ট্রাম্পের নেতৃত্বেই কি তারা আবারও নির্বাচনে যাবে, নাকি নতুন কোনো মুখ সামনে আনবে?
ডেমোক্র্যাটদের জন্য হাকিম জেফ্রিস, জেমস টালারিকো, আব্দুল এল-সায়েদ এবং অন্যান্য বিজয়ী প্রার্থীর উত্থান নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। টেক্সাসের মতো ঐতিহ্যগত রিপাবলিকান ঘাঁটিতে টালারিকোর জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি প্রচারণায় বিভাজনের বদলে ঐক্য ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
অন্যদিকে রিপাবলিকানদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। দলের কোনো প্রার্থী স্থানীয় সমস্যা নিয়ে ভালো প্রচারণা চালালেও ট্রাম্পের জাতীয় নীতির প্রতি অসন্তোষ তাঁকে বিপদে ফেলতে পারে, এবারের নির্বাচনে তার একাধিক উদাহরণ দেখা গেছে।
তবে ডেমোক্র্যাটদেরও আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। ভোটাররা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা ডেমোক্র্যাটদের সব নীতি সমর্থন করেছেন। নির্বাচনের পর তাদেরও প্রমাণ করতে হবে, তারা জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে, স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম।
এখানেই ২০২৮ সালের নির্বাচনের আসল লড়াই। ট্রাম্পবিরোধী জনমতকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করতে না পারলে ডেমোক্র্যাটদের এবারের জয়ও সাময়িক হয়ে যেতে পারে।

ট্রাম্পের ক্ষমতা কমল, কিন্তু যুদ্ধ শেষ নয়
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় নিঃসন্দেহে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কাগুলোর একটি। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রিপাবলিকানরা শুধু আইন প্রণয়নের সুবিধা হারায়নি; হারিয়েছে প্রেসিডেন্টের প্রশাসনকে নির্বিঘ্নে এগিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক ভিত্তিও।
ট্রাম্প অবশ্য এখনো হোয়াইট হাউসে আছেন। তাঁর হাতে ভেটো ক্ষমতা রয়েছে, নির্বাহী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে। কিন্তু সামনে এমন একটি কংগ্রেস, যেখানে তাঁর প্রতিটি বড় নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহিতা দাবি করতে পারে বিরোধীরা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় শুধু ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নয়; এটি রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। MAGA আন্দোলন কতটা টিকে থাকবে, ট্রাম্পের পর দলটির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে এবং ২০২৮ সালে কোন রাজনৈতিক শক্তি এগিয়ে থাকবে- এসব প্রশ্ন এখন থেকেই ওয়াশিংটনের আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে।
যে ট্রাম্প এত দিন বিশ্বকে নিজের ‘ট্রাম্প কার্ড’ দেখিয়ে এসেছেন, এবার তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছে নিজের দেশের কংগ্রেস।
তাঁর হাতে এখনো ভেটোর অস্ত্র আছে, কিন্তু আইন প্রণয়নের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাঁর হাতে হোয়াইট হাউস আছে, কিন্তু কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তাঁর দল এখনো শক্তিশালী, কিন্তু সেই দলের ভেতরেই নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তাই এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু রিপাবলিকানদের পরাজয় নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, একজন প্রেসিডেন্ট যত ক্ষমতাধরই হোন, তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করার সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প কি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করে বাকি দুই বছর পার করবেন, নাকি ভেটো, তদন্ত, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও গভীর বিভাজনের দিকে ঠেলে দেবেন?
এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেস জিতেছেন। কিন্তু সামনে যে ক্ষমতার যুদ্ধ শুরু হচ্ছে, তার শেষ অধ্যায় লেখা হবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে।
তথ্য ও সংবাদ: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস- নির্বাচনের ফল ও প্রভাব, রয়টার্স- নির্বাচনের শিক্ষা, দ্য গার্ডিয়ান-ট্রাম্পের ভেটো ও ডেমোক্র্যাথদের প্রতিক্রিয়া, সিবিএস নিউজ- বুফেরত জরিপ , টেক্সাস ট্রিবিউন- টেক্সাস ট্রিবিউনের ঐতিহাসিক ফলাফল এবং ফক্স নিউজ।

