বাংলাদেশের নদীগুলোতে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি নিখোঁজ মানুষের নিরাপত্তা, অপরাধ তদন্তের সক্ষমতা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।
বাংলাদেশের নদীগুলো কি এখন অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলার নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠছে? সাম্প্রতিক সময়ে নদী থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের খবর সেই প্রশ্নই সামনে আনছে। কোনো মরদেহের পরিচয় মিলছে না, কোথাও হত্যার সন্দেহ উঠছে, আবার কোনো পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। প্রতিটি ঘটনার কারণ এক নয়। কিন্তু এসব ঘটনার তদন্ত ও পরিণতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
প্রশ্নটি তাই শুধু কতটি মরদেহ উদ্ধার হলো, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, মৃত্যুর রহস্য কতটা উন্মোচিত হচ্ছে, অপরাধীরা কতটা বিচারের আওতায় আসছে এবং নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
লাশ উদ্ধার হচ্ছে, রহস্যের সমাধান কতটা?
নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের প্রতিটি ঘটনা হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ নয়। দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু, আত্মহত্যা কিংবা অপরাধ—বিভিন্ন কারণেই এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে মরদেহে আঘাতের চিহ্ন, হাত-পা বাঁধা অবস্থা কিংবা বস্তাবন্দী অবস্থায় উদ্ধারের মতো আলামত পাওয়া গেলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, অনেক ক্ষেত্রে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়ে। পরিচয় না মিললে নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের পক্ষে খোঁজ পাওয়া যেমন অসম্ভব হয়ে ওঠে, তেমনি সম্ভাব্য অপরাধের সূত্রও হারিয়ে যেতে পারে।
এখানে পুলিশের পাশাপাশি ফরেনসিক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতার প্রশ্ন আসে। উদ্ধার করা মরদেহের ছবি, আঙুলের ছাপ, ডিএনএ নমুনা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে অনেক অমীমাংসিত ঘটনার জট খোলা সম্ভব। কিন্তু এসব উদ্যোগ কতটা নিয়মিত, কতটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হচ্ছে এবং কতটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাচ্ছে—তার স্বচ্ছ হিসাব জনসমক্ষে থাকা দরকার।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি কি দায়মুক্তির ধারণা তৈরি করছে?
বিচারহীনতার সংস্কৃতি এক দিনে তৈরি হয় না। অপরাধের তদন্তে গাফিলতি, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্য-প্রমাণের ঘাটতি কিংবা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতা মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।
তবে নদীতে উদ্ধার হওয়া সব মরদেহের ঘটনাকে বিচারহীনতার ফল বলা তথ্যসম্মত হবে না। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যেসব ঘটনায় হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়, সেগুলোর তদন্ত কত দূর এগোয়? কতটি মামলায় অপরাধী শনাক্ত হয়, কতটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এবং কতটি মামলার বিচার শেষ হয়?
এসব তথ্য ছাড়া অপরাধের প্রকৃত চিত্র কিংবা বিচারহীনতার ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা কঠিন। কিন্তু তদন্ত ও বিচারের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি থাকলে সন্দেহ বাড়ে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও দুর্বল হয়।
দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই
নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মরদেহ উদ্ধার, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং অপরাধের তদন্তে নৌ পুলিশ, সংশ্লিষ্ট থানা, জেলা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও ফরেনসিক বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী অন্যান্য সংস্থাকেও যুক্ত হতে হয়। বিচার সম্পন্ন করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের।
এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ শুধু মরদেহ উদ্ধার বা মামলা নথিভুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, অপরাধের প্রমাণ সংরক্ষণ এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার মধ্য দিয়েই তাদের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়।
অবশ্য জনবল, প্রযুক্তি, বিশাল নদীপথে নজরদারি এবং ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বাস্তব চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কোথায় কী ঘাটতি রয়েছে এবং তা কাটিয়ে উঠতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কেও জনগণকে জানাতে হবে।
নিখোঁজ মানুষের পরিবার কার কাছে উত্তর চাইবে?
একটি মরদেহ উদ্ধারের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তদন্ত শুরু হয়, তারপর আলোচনার কেন্দ্র থেকে ঘটনাটি সরে যায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে অনিশ্চয়তা শেষ হয় না। পরিচয়হীন মরদেহের তালিকায় তাঁদের স্বজন রয়েছেন কি না, মৃত্যুর পেছনে অপরাধ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অপেক্ষা চলতেই থাকে।
এই পরিবারগুলোর জন্য তথ্য পাওয়ার সহজ ব্যবস্থা, ডিএনএ পরীক্ষার সুযোগ, তদন্তের অগ্রগতি জানানো এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। নিখোঁজ ব্যক্তির অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সম্ভাব্য অপরাধের সূত্র হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ
প্রথমত, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয়, মৃত্যুর কারণ, সংশ্লিষ্ট মামলা ও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, হত্যার সন্দেহ রয়েছে—এমন অমীমাংসিত মামলাগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, ডিএনএ পরীক্ষা, ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও নদীপথে নজরদারির সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পাশাপাশি নিয়মিতভাবে জানাতে হবে, কতটি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে, কতটি মামলা বিচারাধীন এবং কোথায় তদন্ত আটকে আছে। তদন্তে অবহেলা বা ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধীকে রক্ষার অভিযোগ উঠলে তারও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হওয়া উচিত।
জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে শুধু অপরাধীর বিচার নয়, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতারও আইনসম্মত পর্যালোচনা প্রয়োজন।
নদী নয়, থামুক অপরাধের স্রোত
নদী বাংলাদেশের জীবন ও জীবিকার অংশ। সেই নদী থেকে যখন বারবার মরদেহ উদ্ধারের খবর আসে, তখন মানুষের উদ্বেগকে নিছক আতঙ্ক কিংবা অনুমান বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একই সঙ্গে প্রমাণ ছাড়া প্রতিটি মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়।
প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত, স্বচ্ছ পরিসংখ্যান এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি। প্রতিটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে হবে, অপরাধের প্রমাণ মিললে অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে এবং নিখোঁজ মানুষের পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা যাবে না।
নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার করা পুলিশের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব; কিন্তু মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন, অপরাধের বিচার এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বৃহত্তর দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে অগ্রগতি কতটা—জনগণ এখন তারই স্পষ্ট উত্তর চায়।

