মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন ঘিরে বিতর্কে উঠে এসেছে নাগরিকের মৌলিক মর্যাদা, রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন
একাত্তরে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা একজন মানুষের শেষ ঠিকানা হবে নিজের মাটির কবর। অথচ সেই কবর ঘিরেই যদি রাজনৈতিক বিরোধ, বাধা ও ক্ষমতার প্রদর্শন দেখা যায়, তবে প্রশ্ন ওঠে, স্বাধীন বাংলাদেশে একজন নাগরিকের মৌলিক মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত?
মৃত্যুর পর মানুষ সাধারণত রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক সহমর্মিতার প্রত্যাশা করে। স্বজনেরা শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি নেন, প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসেন, ধর্মীয় রীতিতে সম্পন্ন হয় জানাজা ও দাফন। বাংলাদেশের গ্রামসমাজে এই দৃশ্য বহুদিনের পরিচিত। কিন্তু পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর দাফন ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা এই চেনা সামাজিক বাস্তবতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী ২৪ অক্টোবর ২০২৬ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মারা যান। তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে নেওয়ার পর রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পুলিশি নিরাপত্তায় গভীর রাতে নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
পরিবারের অভিযোগ, কবর খোঁড়ার পর সেটি ভরাট করে দেওয়া হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত পরিবারের নারীদেরই কবর তৈরির কাজে নামতে হয়। অন্যদিকে স্থানীয় জামায়াতের কয়েকজন নেতা দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা নিয়েও আপত্তির বিষয়টি উঠে এসেছে।
অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের নিরপেক্ষ তদন্ত অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এই বিতর্কের মধ্যেও একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: একজন মানুষকে কোথায় সমাহিত করা হবে, সেটিও কি রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয় হয়ে উঠবে?
মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা কি দলীয় পরিচয়ে নির্ধারিত হবে?
মুক্তিযোদ্ধা হওয়া কোনো দলের সদস্যপদের সমার্থক নয়। স্বাধীনতার জন্য যাঁরা লড়েছেন, তাঁদের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। তাঁদের রাজনৈতিক মত, ব্যক্তিগত অবস্থান কিংবা কোনো দলের সঙ্গে বিরোধ থাকতে পারে; কিন্তু এসব কারণে তাঁদের মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা খর্ব করার সুযোগ নেই।
মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কি না, তা নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রীয় যাচাই-বাছাই ও আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে। অভিযোগ থাকলে প্রমাণ হাজির করতে হবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদন্ত করতে হবে এবং আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল, স্থানীয় গোষ্ঠী কিংবা জনতার চাপ সেই প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি গেজেটে নাম থাকা একজন মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে রাষ্ট্রকে যেমন সত্য যাচাই করতে হবে, তেমনি যাচাই শেষ হওয়ার আগে কাউকে জনতার বিচারের মুখে ঠেলে দেওয়াও চলবে না। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি যেমন প্রমাণ ও আইন দিয়ে নির্ধারিত হবে, তেমনি তাঁর শেষ বিদায়ের অধিকারও কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অনুমতির ওপর নির্ভর করতে পারে না।
ধর্মের রাজনীতি, অথচ মানবিকতার ঘাটতি?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা জোরেশোরে উচ্চারিত হয়। কিন্তু সেই মূল্যবোধের বাস্তব পরীক্ষা হয় মানুষের বিপদে, শোকের মুহূর্তে এবং মতবিরোধের পরিস্থিতিতে। মৃত মানুষের প্রতি সম্মান, তাঁর স্বজনদের প্রতি সহমর্মিতা এবং দাফনের মতো মৌলিক ধর্মীয় ও মানবিক কাজে সহযোগিতা নৈতিকতারই বাস্তব প্রকাশ।

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধের কারণে মৃত ব্যক্তির পরিবারকে অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্বের মধ্যে ফেলে দেওয়া হলে ধর্মীয় বক্তব্যের সঙ্গে আচরণের অসংগতি সামনে আসে।
তবে এ ঘটনায় দায় নির্ধারণ করতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। কোনো দলের সব নেতা-কর্মীকে একসঙ্গে অভিযুক্ত করা কিংবা যাচাই ছাড়া কারও বিরুদ্ধে অপরাধের সিদ্ধান্ত দেওয়া ন্যায়বিচারের পথ নয়। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; অভিযোগ অপ্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্ট করতে হবে।
একাত্তরের ইতিহাস কি বর্তমানের আচরণে ফিরে আসে?
মানিক পশারীর ঘটনা শুধু একটি দাফনসংক্রান্ত বিরোধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাত্তরের ইতিহাস, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, সাক্ষীর পরিচয় এবং বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস। ফলে ঘটনাটি আরও গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়। সেই ইতিহাস নিয়ে আলোচনা, বিচার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। কিন্তু অতীতের অপরাধের বিচার যেমন আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় হতে হবে, তেমনি বর্তমানের কোনো বিরোধও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বৈধতা দিতে পারে না।
যে রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পক্ষে দাবি করে, তাদের জন্য এই নীতিগুলো প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া জরুরি। অন্যের অধিকার রক্ষার পরীক্ষা হয় তখনই, যখন সেই অন্য ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে অপছন্দের।
একইভাবে, অতীতের ইতিহাসের দায় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বর্তমানের কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব আইন ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের। রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে কারও নাগরিক অধিকার নির্ধারণ করা যায় না।
রাষ্ট্রীয় সম্মান, কিন্তু নিরাপদ দাফন নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা কেন?
মানিক পশারীকে শেষ পর্যন্ত গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান আর সেই সম্মানের মর্যাদা রক্ষা করা এক বিষয় নয়। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানো হলো, অথচ তাঁর দাফন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হলো এবং পরিবারকে দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হলো। এমন পরিস্থিতি প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল পরিস্থিতি আগেই মূল্যায়ন করা, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো বেআইনি বাধা সৃষ্টি হলে তা প্রতিরোধ করা। দাফন ঘিরে উত্তেজনা কেন তৈরি হলো, কবর ভরাট করার অভিযোগের সত্যতা কী এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের অর্থ কেবল নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন নয়; নাগরিকের আইনসম্মত অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করা। বিশেষত একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে যদি পুলিশি নিরাপত্তা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, তবে সেই পরিস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কবরের সামনে দাঁড়িয়ে রাজনীতির কাছে পাঁচটি প্রশ্ন
- একজন নাগরিকের পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের অধিকার কে নির্ধারণ করবে: আইন, নাকি স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি?
- মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় নিয়ে আপত্তি থাকলে যথাযথ তদন্তের বদলে জনসমক্ষে উত্তেজনা সৃষ্টি করা কেন গ্রহণযোগ্য হবে?
- দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
- রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়ার পরও কেন একটি পরিবারকে এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হলো?
- রাজনৈতিক দলগুলো কি নিজেদের সমর্থকদের আচরণের দায় নেবে, নাকি প্রতিটি ঘটনার পর অস্বীকার ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু মানিক পশারীর পরিবারের জন্য নয়; বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ বিদায়ের অধিকার কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়
একটি সমাজ কতটা মানবিক, তা শুধু তার উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতি দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করতে হয় দুর্বল মানুষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, ভিন্নমতের মানুষ কতটা নিরাপদ এবং শোকের মুহূর্তেও মানুষ পরস্পরের প্রতি কতটা সহমর্মী, তা দিয়ে।
মানিক পশারীর ঘটনা নিয়ে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে আইনসম্মতভাবে তার নিষ্পত্তি হোক। একই সঙ্গে দাফনে বাধা, কবর ভরাট এবং পরিবারের প্রতি অসহযোগিতার অভিযোগেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক। কোনো ব্যক্তি বা দলের রাজনৈতিক পরিচয় যেন তদন্তের ফল নির্ধারণ না করে।
মৃত মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো কোনো রাজনৈতিক দলের উদারতা নয়; এটি সভ্য সমাজের ন্যূনতম শর্ত। আর একজন নাগরিকের শেষ ঠিকানা কোথায় হবে, তা নির্ধারণ করার অধিকার কোনো রাজনৈতিক শক্তির একক সম্পত্তি নয়।
মুক্তিযোদ্ধারা যে বাংলাদেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, সেই বাংলাদেশে তাঁদের শেষ বিদায়ও যদি রাজনৈতিক বিরোধের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তবে আমাদের স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে। কবরের জায়গা নিয়ে রাজনীতি নয়, প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবিকতা এবং জবাবদিহির বাংলাদেশ।

