নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সরকারি ডিপো ‘যমুনা অয়েল’ থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার ডিজেল গায়েবের ঘটনায় রি-ক্যালিব্রেশন প্রতিবেদনে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। নতুন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বছরের পর বছর ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল, অসম্পূর্ণ ও কমানো ক্যালিব্রেশন শিট ব্যবহার করে নিয়মিত তেল চুরির পথ তৈরি করা হয়েছিল। ট্যাংকে যত তেল ঢালা হতো, হিসাবপত্রে তার চেয়ে কম দেখানোই ছিল চক্রের মূল কৌশল।
রি-ক্যালিব্রেশন কমিটির সদস্য এবং যমুনা অয়েলের এজিএম মো. আলমগীর আলম বলেন, প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে সব তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
যমুনা অয়েল সূত্র জানায়, তেল গায়েবের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ২৮ সেপ্টেম্বর ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে এজিএম ও ম্যানেজার পর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়াও সিপিডিএলের প্রকল্প প্রকৌশলী এবং পিটিসিএলের অপারেশন বিভাগের প্রতিনিধি ছিলেন। ক্যালিব্রেশন প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস এম নুরুল হকের প্রতিনিধিও ছিলেন সঙ্গে। ৩০ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবর কমিটির সদস্যরা ফতুল্লা ডিপো পরিদর্শন করেন। এরপর সব পর্যালোচনা ও পুনঃপরিমাপ শেষ করে ১৬ অক্টোবর যমুনা অয়েলের জিএম (অপারেশন) এর কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে এলে আসতে শুরু করে একের পর এক তথ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিবেদন থেকে ডিজেল চুরির কৌশল স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
রি-ক্যালিব্রেশন প্রতিবেদনে যা পাওয়া গেছে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরোনো ক্যালিব্রেশন শিটে ট্যাংকের প্রকৃত উচ্চতা ও ধারণক্ষমতার সঙ্গে বড় ধরনের অসংগতি ছিল। অনেক জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুপস্থিত। কোথাও স্বাক্ষর নেই। কোথাও ভলিউম ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখানো হয়েছে।
নতুন ক্যালিব্রেশনে দেখা যায়, ট্যাংক–২২-এর প্রকৃত ধারণক্ষমতা ৭০ লাখ ৩৮ হাজার ৪০৪ লিটার। কিন্তু পুরোনো ক্যালিব্রেশনে দেখানো হয়েছিল ৬৯ লাখ ৭২ হাজার ২১৭ লিটার। অর্থাৎ ৬৬ হাজার ১৮৭ লিটার কম দেখানো হয়েছিল। এই অদৃশ্য অংশটাই চক্রটি নিয়মিত গায়েব করত।
ট্যাংক–২৩–এও একই কারসাজি পাওয়া গেছে। নতুন ক্যালিব্রেশনে দেখা যায়, ধারণক্ষমতা পুরোনোর চেয়ে ১১ হাজার লিটার বেশি। অর্থাৎ প্রকৃত পরিমাণের তুলনায় হিসাবপত্র দীর্ঘদিন ধরে কম দেখানো হয়েছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, ট্যাংকের ভলিউম কম দেখানোর এই পদ্ধতিই ছিল বহু বছর ধরে চলা জ্বালানি চুরির মূল ফাঁকফোকর। ক্যালিব্রেশনকারী প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি ও তথ্য গোপনের কারণে চক্রটি নিরবচ্ছিন্নভাবে ডিজেল সরিয়ে নিতে পেরেছে।
ফতুল্লা ডিপো থেকে ৩ লাখ ৭৫ হাজার লিটার ডিজেল গায়েব হওয়ার ঘটনা সম্প্রতি জানা যায়। চলতি বছরের জুনে ঢাকা–চট্টগ্রাম পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা টার্মিনাল থেকে সরাসরি ফতুল্লায় ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়। এই পাইপলাইন দিয়েই ট্যাংক–২২ এবং ট্যাংক–২৩–এ তেল আসে।
ট্যাংক–২২ পুরোনো। নতুন সক্ষমতা সনদ দিতে গিয়ে মজুত ক্ষমতা জালিয়াতির মাধ্যমে কম দেখানো হয়। ট্যাংক–২৩ নতুন নির্মিত হলেও শুরু থেকেই এটির সক্ষমতা কমিয়ে দেখানো হয়। উভয় বিষয়ই রি-ক্যালিব্রেশন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, জ্বালানি খাত এখন অনিয়মে পরিপূর্ণ। সরকারি বনখেকো বা ভূমিখেকোর মতো এখন তেলখেকোর কথাও শোনা যাচ্ছে। কর্মকর্তাদের আচরণ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন না এলে এ ধরনের দুর্নীতি কমবে না।

