একটি হাসপাতালের চেয়ারে বসে আছে এক কিশোরী। হাতে স্যালাইনের ক্যানুলা। কয়েক ঘণ্টা আগে তাকে একটি গোডাউন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে-অভিযোগ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের। স্বাভাবিকভাবেই এই দৃশ্যের কেন্দ্রে থাকার কথা ছিল তার নিরাপত্তা, চিকিৎসা, মানসিক অবস্থা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ সেই গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে এলো অন্য কিছু ‘কিশোরীর একটি হাসি’।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান অনুযায়ী, সাক্ষাৎকার শুরুর আগের একটি অনানুষ্ঠানিক মুহূর্তে কিশোরী হেসেছিলেন। সেই কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য পরে একটি প্রতিবেদনে একাধিকবার ব্যবহার করা হয়। অন্য একটি টেলিভিশন প্রতিবেদনেও একই দৃশ্য পুনরাবৃত্তি করা হয়। অনুসন্ধানটি আরও দেখায়, ঘটনাটির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই হাসিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং ভিডিওটি বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়।
এখানে আসল প্রশ্ন কিশোরী কেন হেসেছিলেন-তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, একটি দীর্ঘ ভিডিও থেকে ওই কয়েক সেকেন্ডই কেন বারবার বেছে নেওয়া হলো? কারণ সংবাদমাধ্যম কেবল ঘটনা ধারণ করে না। সংবাদমাধ্যম ঘটনা থেকে একটি সংস্করণ তৈরি করে। আর সেই সংস্করণ তৈরির প্রথম ধাপই হলো, কী দেখানো হবে এবং কী বাদ যাবে, সেই সিদ্ধান্ত।
খবর কি শুধু যা ঘটেছে, তা-ই?
সাংবাদিকতার সবচেয়ে প্রচলিত আত্মপরিচয় হলো “আমরা মতামত দিই না, তথ্য দিই।” কথাটি শুনতে নিরপেক্ষ। কিন্তু বাস্তবে কোনো সংবাদই কেবল তথ্যের স্তূপ নয়। একজন প্রতিবেদক সিদ্ধান্ত নেন কাকে সাক্ষাৎকার দেবেন। ক্যামেরাম্যান ঠিক করেন কোথায় ক্যামেরা রাখবেন। সম্পাদক ঠিক করেন কোন দৃশ্য প্রথমে যাবে। ডিজিটাল ডেস্ক ঠিক করে কোন অংশের ওপর শিরোনাম বসবে। সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম আবার ঠিক করে কোন সংস্করণটি বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। অর্থাৎ একটি সংবাদ তৈরির প্রতিটি ধাপে নির্বাচন আছে। সেই নির্বাচনই সংবাদকে অর্থ দেয়।
একজন ভুক্তভোগীর কান্না দেখালে দর্শকের মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তার হাসি দেখালে তৈরি হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। দুটিই ক্যামেরায় ধারণ করা বাস্তব দৃশ্য হতে পারে। কিন্তু দুটির সামাজিক অর্থ এক নয়। সুতরাং মিথ্যা না বলেও একটি সংবাদ বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
কখনো একটি দৃশ্যের প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে, কখনো একটি শব্দকে শিরোনামে বসিয়ে, কখনো কোনো ঘটনার একটি অংশকে বারবার দেখিয়ে, আর কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই বাদ দিয়ে।
ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনাটি সাংবাদিকতার একটি বড় দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—ভুক্তভোগীর আচরণ সম্পর্কে সমাজের পূর্বধারণা কীভাবে সংবাদ সম্পাদনার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ধর্ষণের শিকার একজন মানুষকে কেমন দেখতে হবে—তার একটি প্রচলিত সামাজিক ছবি আমাদের মাথায় আছে: তিনি কাঁদবেন, তিনি ভেঙে পড়বেন, তিনি নিশ্চুপ থাকবেন, তিনি আতঙ্কিত থাকবেন।
কিন্তু বাস্তব মানুষ সব সময় সেই ছকে আচরণ করেন না। ট্রমার প্রতিক্রিয়াও একরকম নয়। কেউ কাঁদেন, কেউ চুপ থাকেন, কেউ অস্বাভাবিকভাবে হাসেন, কেউ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো ভুক্তভোগী সেই পূর্বনির্ধারিত ছবির সঙ্গে না মিললে সাংবাদিকতার দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল বাস্তবতাকে বোঝা, বাস্তবতাকে সন্দেহ করা নয়।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একটি নিউজরুমের পক্ষ থেকে ওই দৃশ্যকে অস্বাভাবিক মনে হওয়ার ব্যাখ্যা এসেছে। এখানেই সমস্যাটি আরও গভীর হয়। কারণ সাংবাদিকতা যদি ভুক্তভোগীর আচরণকে আগে থেকে তৈরি একটি মানসিক ছকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে, তাহলে সংবাদ আর কেবল তথ্য পরিবেশন করে না—ভুক্তভোগীর চরিত্রেরও একটি ব্যাখ্যা তৈরি করে। এর ফল ভয়াবহ হতে পারে। একটি ভিডিও তখন সংবাদ থাকে না, তা হয়ে যায় সামাজিক বিচারের উপাদান।
একই ফুটেজ, ভিন্ন সিদ্ধান্ত
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা সামনে আসে। একই ঘটনা নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম কাজ করলেও তাদের সম্পাদনার সিদ্ধান্ত এক ছিল না। অর্থাৎ বিতর্কিত দৃশ্যটি দেখানো কোনো অনিবার্য সাংবাদিকতাগত প্রয়োজন ছিল না। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ তখন “চাপ ছিল”, “ভিউ দরকার ছিল”, “ফুটেজ পাওয়া গিয়েছিল”—এসব ব্যাখ্যা পুরোপুরি যথেষ্ট হয় না।
যদি একই ঘটনার প্রতিবেদন করতে গিয়ে একজন সম্পাদক একটি সংবেদনশীল দৃশ্য বাদ দিতে পারেন, অন্যজন সেটিকে তিনবার ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে বিষয়টি প্রযুক্তিগত ভুলের চেয়ে বেশি কিছু। এটি সম্পাদনাগত সিদ্ধান্ত। আর সিদ্ধান্তের সঙ্গে দায়ও থাকে।
ইরাকের যুদ্ধ: সত্য দেখিয়েও কীভাবে অসম্পূর্ণ সত্য তৈরি হয়
এই সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের নয়। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইউনিটের সঙ্গে সাংবাদিকদের যুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল “embedded journalism” ব্যবস্থায়। সাংবাদিকরা সৈন্যদের সঙ্গে থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে রিপোর্ট করতেন। এতে সাংবাদিকরা যুদ্ধের খুব কাছে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু কাছাকাছি থাকা মানেই সবকিছু দেখা নয়।
২০০৩ সালের প্রথম দিকের কভারেজ নিয়ে Project for Excellence in Journalism-এর গবেষণায় ১০৮টি এমবেডেড টেলিভিশন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ৯৪ শতাংশ প্রতিবেদন মূলত তথ্যনির্ভর ছিল। কিন্তু একই গবেষণা দেখায়, এই ধরনের রিপোর্টিংয়ের বড় সীমাবদ্ধতা ছিল—সাংবাদিকরা মূলত যা নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছিলেন, সেটিই তুলে ধরছিলেন; বৃহত্তর প্রেক্ষাপট অনেক সময় অনুপস্থিত ছিল।
এখানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে। একজন সাংবাদিক যদি ট্যাংকের ওপর বসে যুদ্ধ দেখেন, তিনি ট্যাংকের গতিবিধি খুব ভালোভাবে দেখবেন। কিন্তু ট্যাংকের গোলা যেখানে গিয়ে পড়ছে, সেখানে তিনি নাও থাকতে পারেন। ফলে তার প্রতিবেদন মিথ্যা নয়—সৈন্যরা সত্যিই এগিয়েছে, ট্যাংক সত্যিই চলেছে, গুলি সত্যিই ছোড়া হয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবেদনের বাইরে থেকে যেতে পারে—গুলি যাদের ওপর পড়েছে তাদের গল্প। এটাই “ফ্রেমের সত্য” এবং “বাস্তবতার পূর্ণ সত্য”-এর পার্থক্য।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা অন্য রূপে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংঘর্ষগুলোর দিকে তাকালেও বিষয়টি বোঝা যায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৩৫০টি সংঘর্ষের তথ্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ আহত এবং কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর এসেছে। সংঘর্ষের অনেকগুলোর সূচনা হয়েছে আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে, কিন্তু দ্রুত তা গোষ্ঠীগত আধিপত্য ও প্রতিশোধের সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
এই সংঘর্ষগুলোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যম সেসব ফুটেজ ব্যবহার করে। দর্শক দেখে। ভিডিও ভাইরাল হয়। আবার নতুন সংঘর্ষের ভিডিও তৈরি হয়। এখানে একটি চক্র তৈরি হয়:
সংঘর্ষ – ভিডিও -ভাইরাল – দর্শক – অর্থনৈতিক মূল্য – আরও ভিডিও – আরও সংঘর্ষ।
ফলে ভিডিও কখনো শুধু সংঘর্ষের প্রমাণ থাকে না, কখনো সেটিই সংঘর্ষের সামাজিক প্রচারক হয়ে ওঠে। একটি গ্রামীণ সংঘর্ষ স্থানীয় মানুষের কাছে হয়তো গোষ্ঠীর মর্যাদার লড়াই। সংবাদমাধ্যমের কাছে তা হয় “ভাইরাল কনটেন্ট”। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটি হয়ে যায় বিনোদন, উত্তেজনা কিংবা পক্ষ নেওয়ার উপাদান। একই দৃশ্যের তিনটি জীবন।
ভিউয়ের অর্থনীতি কি সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে বদলে দিচ্ছে?
ডিজিটাল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো দর্শকসংখ্যা এখন শুধু জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যবসায়িক সম্পদের অংশ। ফলে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিউয়ের হিসাব ঢুকে পড়েছে। কোন শিরোনামে বেশি ক্লিক হবে? কোন ছবিতে মানুষ থামবে? কোন ভিডিও বেশি সময় দেখা হবে? কোন দৃশ্য মানুষ শেয়ার করবে?
এই প্রশ্নগুলো যদি সাংবাদিকতার প্রশ্নকে ছাড়িয়ে যায়, তখন সংবাদ ধীরে ধীরে “কনটেন্টে” পরিণত হয়। আর কনটেন্টের বাজারে সবচেয়ে বেশি দাম পায় উত্তেজনা, অপমান, রক্ত, কান্না, সংঘর্ষ, অস্বাভাবিক আচরণ—এবং ভুক্তভোগীর এমন কোনো মুহূর্ত, যা দেখে দর্শক তাকে নিয়ে সন্দেহ করতে পারে। ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনাটি সেই অর্থনীতির একটি নির্মম উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়।
ক্যামেরা কখন রাষ্ট্রের চোখ হয়ে যায়?
গণমাধ্যমের আরেকটি বিপজ্জনক জায়গা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা। যখন পুলিশ কোনো অভিযানকে এমনভাবে ক্যামেরার সামনে পরিচালনা করে, যাতে টেলিভিশন ফুটেজ তৈরি হয়, তখন সাংবাদিক আর কেবল ঘটনাটির পর্যবেক্ষক থাকেন না। তিনি হয়ে যেতে পারেন রাষ্ট্রীয় বয়ানের পরিবেশক। এখানে সমস্যা হলো—পুলিশের হাতে ক্ষমতা আছে, সাংবাদিকের হাতে ক্যামেরা আছে। কিন্তু ক্যামেরা যদি ক্ষমতার দিকেই সবসময় তাকিয়ে থাকে, তাহলে ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষটির বক্তব্য অদৃশ্য হয়ে যায়।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় আটক আন্দোলনকারীদের টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিও বার্তাগুলো নিয়েও পরে জোরপূর্বক বক্তব্য দেওয়ানোর অভিযোগ ওঠে। ফলে পর্দায় যে দৃশ্যটি “স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিবৃতি” হিসেবে দেখা গিয়েছিল, তার পেছনের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এখানে সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি হলো—ক্যামেরার সামনে যা ঘটছে, শুধু তা নয়; ক্যামেরা চালু হওয়ার আগে কী ঘটেছিল, সেটিও খুঁজে দেখা।
গাজা: যখন ফ্রেমের দরজাই বন্ধ
এই প্রশ্ন আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় আরও কঠিন রূপ পেয়েছে গাজায়। CPJ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত গাজা ও ইসরায়েলি বন্দিশালায় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীর সংখ্যা ২০৯ হিসেবে নথিভুক্ত ছিল। একই সঙ্গে CPJ জানিয়েছে, গাজায় আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের স্বাধীন প্রবেশাধিকার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে।
এখানে “কে ক্যামেরা চালাবে”—এই প্রশ্নটি সরাসরি “কে বাস্তবতা দেখাবে”—এই প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার সীমিত হলে সংবাদমাধ্যমের সামনে থাকা বাস্তবতাও সীমিত হয়। আর যখন কোনো পক্ষই শুধু ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করে, তখন সে পক্ষ কেবল যুদ্ধের মাঠ নয়, যুদ্ধের দৃশ্যমানতাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ কারণেই সাংবাদিকতার স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিককে স্বাধীনভাবে লিখতে দেওয়ার বিষয় নয়—সাংবাদিককে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়াও স্বাধীনতার অংশ।
আবারও প্রমাণ হয়—ক্যামেরা নিজে নিরপেক্ষ নয়
তবে এর মানে এই নয় যে ক্যামেরা সবসময় ক্ষমতার হাতিয়ার। পুরান ঢাকার মিটফোর্ডে সোহাগ হত্যার মতো ঘটনায় ভিডিওই হয়ে উঠতে পারে অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। অর্থাৎ একই ক্যামেরা একদিকে একজন ভুক্তভোগীকে দ্বিতীয়বার সামাজিক বিচারের মুখে ঠেলে দিতে পারে, অন্যদিকে একজন হত্যাকাণ্ডের একমাত্র দৃশ্যমান সাক্ষীও হয়ে উঠতে পারে।
তাই সমস্যা ক্যামেরায় নয়। সমস্যা হলো—ক্যামেরার দিক কে নির্ধারণ করছে? কোন মুহূর্তে রেকর্ডিং শুরু হচ্ছে? কোন অংশ কেটে দেওয়া হচ্ছে, আর কোন অংশ পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে? কোন মুখ ঝাপসা করা হচ্ছে, কোন মুখ দেখানো হচ্ছে? কার বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে, আর কার বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই সাংবাদিকতার নৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হয়।
আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ কোথায়?
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ না করার জন্য আইনি বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৪ ধারায় পরিচয় প্রকাশের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আইন থাকার পরও সংবাদমাধ্যমে ভুক্তভোগীর ছবি, নাম বা পরিচয়-উন্মোচনকারী তথ্য প্রকাশের ঘটনা ঘটছে।
তাহলে প্রশ্নটি শুধু আইন আছে কি না—এটি নয়। প্রশ্ন হলো, আইন ভাঙলে জবাবদিহি কোথায়? একটি সংবাদমাধ্যম ভুল করলে “দুঃখিত” বলা যথেষ্ট কি না, সেটিও নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ একটি ভিডিও একবার ইন্টারনেটে গেলে তা আর পুরোপুরি ফেরত নেওয়া যায় না। প্রতিবেদন মুছে ফেলা যায়, কিন্তু স্ক্রিনশট মুছে ফেলা যায় না, শেয়ার বন্ধ করা যায় না, ডাউনলোড করা কপি মুছে ফেলা যায় না। আর সবচেয়ে বড় কথা—একজন ভুক্তভোগীর সামাজিক পরিচয়ের ওপর যে ক্ষত তৈরি হয়, সেটিও ডিলিট বাটনে মুছে যায় না।
আসল সংকটটি “ভুল” নয়, জবাবদিহির অভাব
ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনায় দায় যখন প্রতিবেদক, ডেস্ক, ডিজিটাল বিভাগ কিংবা সম্পাদনা প্রক্রিয়ার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়, তখন একটি মৌলিক সমস্যা সামনে আসে। গণমাধ্যমে কি এমন কোনো কাঠামো আছে, যেখানে বলা যাবে—এই সিদ্ধান্তটি কে নিয়েছিলেন? কেন নিয়েছিলেন? কোন নীতির ভিত্তিতে নিয়েছিলেন? কেউ আপত্তি তুলেছিল কি না? সম্পাদনার আগে ভুক্তভোগীর পরিচয় সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল কি না? ডিজিটাল প্রকাশের পর ভুল ধরা পড়লে কে সিদ্ধান্ত নেবেন? এগুলো পরিষ্কার না থাকলে “মানবিক ভুল” শব্দটি খুব সহজেই দায় এড়ানোর ঢাল হয়ে যায়।
দর্শকেরও কি কোনো দায় নেই?
এই আলোচনায় দর্শকের ভূমিকাটিও বাদ দেওয়া যায় না। মিডিয়া যা দেখায়, দর্শক যদি সবসময় সেটিই চায়, তাহলে বাজার সেই চাহিদা মেটাতে আরও উত্তেজক কনটেন্ট তৈরি করবে। একটি ভুক্তভোগীর বিব্রতকর মুহূর্তে লাখ লাখ মানুষ ক্লিক করলে সেটি কেবল সাংবাদিকতার ব্যর্থতা নয়—এটি দর্শকের আচরণেরও প্রতিফলন। আমরা কী দেখতে চাই? কেন দেখতে চাই? কেন শেয়ার করি? কেন একটি মানুষের ব্যক্তিগত দুর্দশাকে বিনোদনের উপাদান বানাই? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া সংবাদমাধ্যমের সংস্কারও অসম্পূর্ণ থাকবে।
নতুন সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
আজকের সাংবাদিকতার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মিথ্যা শনাক্ত করা নয়। বরং সত্যের কোন অংশটি সামনে আনা হচ্ছে এবং কোন অংশটি আড়ালে যাচ্ছে—তা শনাক্ত করা। একটি ভিডিও সত্য হতে পারে, একটি ছবি সত্য হতে পারে, একটি উদ্ধৃতিও সত্য হতে পারে। তারপরও পুরো প্রতিবেদনটি বাস্তবতার একটি বিকৃত ছবি তৈরি করতে পারে। কারণ সত্যকে মিথ্যা বানানোর জন্য সবসময় মিথ্যা বলার প্রয়োজন হয় না—কখনো সত্যের একটি অংশকে অন্য অংশের ওপর বসিয়ে দিলেই যথেষ্ট।
প্রতিটি ফ্রেমের বাইরে আরেকটি ফ্রেম আছে
ঠাকুরগাঁওয়ের কিশোরীর হাসি হয়তো বাস্তব ছিল। ইরাকের ট্যাংকও বাস্তব ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংঘর্ষের ভিডিওও বাস্তব। পুলিশের অভিযানও বাস্তব। গাজার ধ্বংসস্তূপও বাস্তব। কিন্তু বাস্তবতার প্রতিটি দৃশ্যের বাইরে আরও একটি বাস্তবতা থাকে। সেটিই সাংবাদিকতার সবচেয়ে কঠিন জায়গা। যা দেখা যাচ্ছে, তার পাশাপাশি যা দেখানো হচ্ছে না—সেটিও খবর।
একজন সাংবাদিক যখন ক্যামেরা তাক করেন, তখন তিনি শুধু একটি দৃশ্য ধারণ করেন না; তিনি দর্শকের সামনে বাস্তবতার একটি দরজা খুলে দেন। কিন্তু একই সঙ্গে আরও কয়েকটি দরজা বন্ধ করে দেন। সেই বন্ধ দরজার ওপারে কী ছিল—সাংবাদিকতার প্রকৃত অনুসন্ধান সেখান থেকেই শুরু হওয়া উচিত।
কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু “কী বলতে পারি”—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর আরেকটি কঠিন প্রশ্ন হলো—
“কী দেখানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, আর কী দেখানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না—তার দায় কে নেবে?”
এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ক্যামেরা আমাদের বাস্তবতা দেখাবে ঠিকই। কিন্তু সেই বাস্তবতা কতটা পূর্ণ—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

