উন্নয়নের চাকার এক পাশে জ্বালানির সংকট, অন্য পাশে শ্রমিকের ক্ষোভ আর মাঝে ঋণের ভারে নুয়ে পড়ছে অর্থনীতি। দেশে জ্বালানির সরবরাহ নেই, মজুরির দাবিতে লাখো শ্রমিক রাস্তায়, আর এর মধ্যেই নতুন করে আইএমএফের ঋণের দিকে তাকাতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
জ্বালানির ব্যয় বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, শ্রমিকের আয় কমে যায়, অসন্তোষ বাড়ে, কারখানা থেমে যায়। উৎপাদন কমে গেলে রপ্তানি ও রাজস্ব কমে, আর তখন ঋণ শোধের সামর্থ্যও সংকুচিত হয়। এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশের অর্থনীতি কি এই তিনমুখী চাপ সামলে আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারবে?
গত তিন দশকে অর্থনীতির অগ্রগতি
গত দুই থেকে তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে দেশটি ক্রমে শিল্প ও সেবানির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। মাথাপিছু আয়ও ২০০০ সালের কয়েকশ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ২০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে শিল্প খাতের অবদান বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু অর্থনীতির এই অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন কিছু দুর্বলতাও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে বেশি হলেও অতীতের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারার তুলনায় কম। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিও কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমেছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে এবছর মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ হতে পারে।
একসময় যে অর্থনীতির অগ্রগতির প্রধান চালিকা শক্তি ছিল রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও শিল্পায়ন, সেই অর্থনীতিকেই এখন জ্বালানি নিরাপত্তা, শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
সংকটের আরেকটি কারণ হলো নতুন বিনিয়োগ না থাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির নতুন ঋণপত্র খোলার পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৫১৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি শিল্প সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৬ সালের ১ নভেম্বর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিবেচনার জন্য সরকার ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করে। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি, খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয়ের বাস্তবতায় শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
অন্যদিকে, কারখানার মালিকদেরও রয়েছে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং সীমিত মুনাফার চাপ। হঠাৎ বড় অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধি অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হতে পারে।রয়টার্সের ১ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ৫২৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল এবং প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন। পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এবং দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে।
কিন্তু এই রপ্তানির পিছনে বড় কারণ হল বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ কম। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতারাই আর আসবেন না। কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন কমে যায়, ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ সম্ভব না হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা নতুন ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
বৈদেশিক ঋণ: উন্নয়ন ব্যয়ের পাশাপাশি বাড়ছে পরিশোধের দায়
অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে গত কয়েক বছরে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থের জোগান দিলেও এখন সেগুলোর আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। সাথে দেশের খেলাপিঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৩ শতাংশ।
আবার বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের পতনের পর ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণের চুক্তি করেছিল। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই ঋণের আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। কিন্তু এখন আবার সরকার আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই ঋণ শোধ করার সামর্থ্য কোথায়?
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ প্রায় ৪ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার। টাকার হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ ছিল প্রায় ৪৯১ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে আসল পরিশোধও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বৈদেশিক ঋণের এই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি আমদানির ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারেও চলছে যুদ্ধ ও মন্দা। তেল ও এলএনজির দাম বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়ে। একই সময়ে ঋণ পরিশোধের জন্যও ডলার প্রয়োজন হয়। ফলে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে পরিকল্পনার ঘাটতি
দ্য ডেইলি স্টারের ৬ নভেম্বরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২৫টি বোয়িং ও ১০টি এয়ারবাস কেনার চুক্তি, স্বচ্ছতা ও আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা না করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রয়োজন নেই এমন অনেক বড় প্রকল্পের কাজ হাতে নেওয়া হচ্ছে।
২০২৬-২৭ সালে সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অর্থনীতিবিদ বলেন,”সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে বরাদ্দ ও পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বাস্তবে যাত্রাপালা, সার্কাসসহ ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পুনরুজ্জীবন এবং এসব খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় যুক্ত করার ক্ষেত্রে তার প্রত্যাশিত প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি।”
সরকারের ১০টি অগ্রাধিকারের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে ১০ নম্বরে রাখা হয়েছে। অথচ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পরিকল্পনা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে পথ
রাজস্ব বাড়াতে হবে: করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ এবং কর আদায়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে।
ব্যয় কমাতে হবে: অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
শিল্পভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে: নতুন শিল্প স্থাপন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
উৎপাদন সম্ভাবনার সীমা (Production Possibility Frontier) বাড়াতে হবে: প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে অর্থনীতির সামগ্রিক উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণ করতে হবে।
ব্যাংকিং খাতে সংস্কার আনতে হবে: খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে।
বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে: তৈরি পোশাকের পাশাপাশি নতুন পণ্য ও রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে: সরকারি আয়-ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনা এবং ঋণের অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
জনসংখ্যার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে: জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে শ্রমবাজারের সামঞ্জস্য তৈরি করতে হবে।
জ্বালানি খাতের অবনতি ঠেকাতে হবে: নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

