দীর্ঘ উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে টানটান পরিস্থিতির মধ্যেই এবার নতুন এক কূটনৈতিক মোড়ের ইঙ্গিত মিলছে। যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি এখন গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে ইরান। একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র বলছে, দুই দেশ একটি সম্ভাব্য সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস মনে করছে তেহরানের সঙ্গে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু ঘোষণা হয়নি, তবু পর্দার আড়ালে যে আলোচনা জোরেশোরে চলছে, তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই।
তবে ইরানের অভ্যন্তরে এ নিয়ে মতপার্থক্যও স্পষ্ট। দেশটির পার্লামেন্টের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য পুরো প্রস্তাবকে ‘ইচ্ছার তালিকা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ, তেহরানের ক্ষমতাকেন্দ্রের সবাই এখনো এই সমঝোতার বিষয়ে একমত নয়। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব নিয়ে তাদের অবস্থান পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে জানানো হবে। এতে বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তান এখন এই সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছেন, তারা কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং স্থায়ী শান্তির পথ তৈরির চেষ্টা করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির বাস্তবতায় এই বক্তব্যকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আলোচনার ব্যাপারে আশাবাদী সুরে কথা বলেছেন। তার দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় দুই পক্ষের মধ্যে “খুব ভালো আলোচনা” হয়েছে এবং একটি চুক্তি সম্ভব হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষায় যে পরিবর্তন এসেছে, সেটিও কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জানা গেছে, সম্ভাব্য সমঝোতার খসড়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা, তেহরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তিনটি বিষয়ই বর্তমানে সংঘাতের মূল কেন্দ্র। কারণ, একদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ রয়েছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় যে কোনো উত্তেজনা সরাসরি তেলের বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলে।
তবে এখনো অনেক কিছু অনিশ্চিত। বিভিন্ন সূত্র বলছে, চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবের বেশিরভাগ শর্ত কার্যকর হবে না। অর্থাৎ, আলোচনা ইতিবাচক হলেও এখনই স্থায়ী সমাধান ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধ ও কূটনীতি—দুই পথই এখনো খোলা। তবে সাম্প্রতিক বার্তাগুলো অন্তত এটুকু স্পষ্ট করছে যে, দীর্ঘ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই এখন সরাসরি সামরিক মোকাবিলার বদলে সমঝোতার পথ খুঁজতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
সিভি/এইচএম

