নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসকে ঘিরে শেয়ারহোল্ডারদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর। কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের টানাপোড়েন, আইনি জটিলতা এবং পর্ষদ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনিশ্চিত হয়ে গেছে। এতে ভবিষ্যৎ লভ্যাংশ, কোম্পানির আর্থিক অবস্থান এবং শেয়ারের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বাজারে।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত সাড়ে তিন মাস ধরে কোম্পানিটি এমন একটি প্রশাসনিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে, যেখানে কার্যত কে প্রতিষ্ঠানটির বৈধ নিয়ন্ত্রণে আছে তা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে, বর্তমানে যাদের হাতে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তাদের সেই ক্ষমতা প্রয়োগের বৈধতা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। তবে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় কমিশনও সরাসরি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কোম্পানির করপোরেট কার্যক্রমে। নিয়ম অনুযায়ী চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন এপ্রিলের মধ্যেই প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু পর্ষদ সভা না হওয়ায় এখন পর্যন্ত সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ফলে জুন শেষে বার্ষিক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ও সম্ভাব্য লভ্যাংশ ঘোষণাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ জানুয়ারির এক পর্ষদ সভাকে কেন্দ্র করে। ওই সভায় নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার অভিযোগ তোলেন তৎকালীন চেয়ারম্যান সাইকা মাজেদ। পরদিন বিএসইসির কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তিনি দাবি করেন, সভায় এমন কয়েকজন সাবেক পরিচালক অনলাইনে যুক্ত হন, যারা প্রায় দুই বছর আগেই পদত্যাগ করেছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা বিদেশে চলে যান বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
সাইকা মাজেদের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ওই ব্যক্তিদের সভা থেকে অপসারণের নির্দেশ দিলেও তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. সাঈদ আহমেদ তাদের বহাল রাখেন। একই সভায় নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে জাবেদ কায়সার আলী এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সাঈদ আহমেদের নিয়োগ অনুমোদনের খবর পরদিন স্টক এক্সচেঞ্জে প্রকাশ করা হয়। অথচ এসব বিষয়ে সভার নির্ধারিত এজেন্ডায় কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে বিষয়টি তদন্তে নামে বিএসইসি। গত ১০ মার্চ কমিশন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে চেয়ারম্যান পরিবর্তন ও নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়াকে আইনসম্মত নয় বলে মত দেওয়া হয়। পরে কমিশন আগের পরিচালনা পর্ষদ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সেই সিদ্ধান্তও উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
এদিকে প্রশাসনিক অচলাবস্থার কারণে কোম্পানির স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি সচিব আমিনুল হক জানিয়েছেন, আর্থিক হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এজন্য আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে অতিরিক্ত সময় চেয়ে কমিশনের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে দীর্ঘ সময় প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কারণ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্ব হলে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীরা অন্ধকারে থাকেন। একই সঙ্গে লভ্যাংশ ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা শেয়ারের দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের মতে, নাভানা ফার্মার বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নয়, বরং এটি করপোরেট সুশাসন ও বাজার ব্যবস্থাপনার জন্যও বড় সতর্কবার্তা। দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসন এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত না হলে কোম্পানিটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

