বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস- এর দেড় বছরের শাসনামলে নেওয়া কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি, বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয় এবং হামের টিকা সংকট—এই তিন ইস্যু এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সমালোচকদের দাবি, এসব সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি, নীতিগত স্বাধীনতা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ চুক্তি নিয়ে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়। সরকার এটিকে পারস্পরিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরলেও অর্থনীতিবিদ ও নীতিবিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, দলিলের ভাষা ও শর্ত বিশ্লেষণ করলে দুই দেশের দায়বদ্ধতার মধ্যে বড় ধরনের অসমতা দেখা যায়।
চুক্তির ৩২ পৃষ্ঠার নথিতে ‘শ্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ১৭৯ বার, যার অধিকাংশই বাংলাদেশের জন্য বাধ্যবাধকতা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি বাধ্যতামূলক শর্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত একটি অসম বাণিজ্য কাঠামো, যেখানে বাংলাদেশের নীতি-স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
চুক্তির বিভিন্ন ধারায় মার্কিন কৃষিপণ্য, যন্ত্রাংশ ও ডিজিটাল সেবাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয় উল্লেখ আছে বলে দাবি উঠেছে। সমালোচকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ চাইলে কিছু খাতে নিজস্ব শিল্প সুরক্ষায় নীতিগত পদক্ষেপ নিতে বাধার মুখে পড়তে পারে। এমনকি রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি নীতিতেও বাইরের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশ্লেষণ উদ্ধৃত করে বলা হচ্ছে, এই চুক্তির আওতায় আগামী এক দশকে হাজার হাজার মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে হতে পারে। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্প প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং তৈরি পোশাক খাতের বাজার সম্প্রসারণে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাড়তি প্রবেশাধিকার বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
একই সময়ে বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়েছে। Boeing-এর সঙ্গে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তিকে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের বড় আর্থিক অঙ্গীকারগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, অর্থনৈতিক চাপের সময়ে এত বড় ব্যয়ের সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবসম্মত ছিল।
বিমান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া এ ধরনের বড় ক্রয়চুক্তি স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। যদিও সংশ্লিষ্ট মহল দাবি করছে, বহরের আধুনিকায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য খাতেও সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হামের টিকা সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের পর দেশে টিকা সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী সংকট দেখা দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। UNICEF জানিয়েছে, সম্ভাব্য সংকট নিয়ে সরকারকে আগেভাগেই একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।
ফলে ২০২৬ সালে দেশে হাম সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের টিকাদান কর্মসূচিতে এমন বিঘ্ন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকার ঘাটতিই নয়, এই পরিস্থিতি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও সামনে এনে দিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, টিকাদান কর্মসূচি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সব মিলিয়ে দেড় বছরের শাসনামলে নেওয়া বড় অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। একপক্ষ বলছে, এসব সিদ্ধান্ত দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, বৈশ্বিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখন মূল প্রশ্ন—এই সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জনস্বাস্থ্যে কতটা গভীরভাবে পড়বে।

