বাংলাদেশে হামের টিকার দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হওয়ার আগেই সরকারকে একাধিকবার সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ। তবে সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দেশে রুটিন টিকাদান কার্যক্রম বড় ধরনের চাপে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত হাম সংক্রমণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছে যায় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলা’ বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ২০২৪ সাল থেকেই সম্ভাব্য টিকা সংকট নিয়ে সরকারকে ধারাবাহিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। এ সময় অন্তত ১০টি বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ৫ থেকে ৬টি আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হয়েছিল সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে।
ইউনিসেফ জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—উভয় পক্ষই আগেভাগে সংকটের তথ্য পেয়েছিল। তবুও টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি অর্থসংকটের কারণে হয়নি; মূল সমস্যা ছিল ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা তথ্যে বলা হয়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ মাত্র ১ কোটি ৭৮ লাখ ডোজ হামের টিকা পেয়েছে। অথচ বছরে দেশে প্রায় ৭ কোটি ডোজ টিকার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ ছিল অনেক কম। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে রুটিন টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় এবং বহু শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা নিতে পারেনি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানে এমন বিঘ্ন তৈরি হলে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় অল্পসংখ্যক টিকাবঞ্চিত শিশুও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ইউনিসেফের মতে, টিকার ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের একটি বড় অংশ সুরক্ষার বাইরে থেকে যায়। এর ফলেই সাম্প্রতিক সময়ে হাম সংক্রমণ বেড়ে যায় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। চলতি বছরের মে মাস থেকে আবারও নিয়মিতভাবে হামের টিকা দেশে আসতে শুরু করেছে। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা এখন জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট ভবিষ্যতের জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা। তারা বলছেন, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা ও প্রশাসনিক ধীরগতি অব্যাহত থাকলে শুধু হাম নয়, অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগও নতুন করে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

