ডিজিটাল যুগে এসে উন্নতির নানা দিক থাকলেও দেশের হাট-বাজারে এখনো পুরোনো ধাঁচেই চলছে কেনাবেচা। চাল, ডাল থেকে শুরু করে মাছ-মাংস—সবই অনেক জায়গায় এখনো দাঁড়িপাল্লায় মাপা হচ্ছে। আর এই পরিমাপেই চলছে কারচুপি। কম ওজন দিয়ে ভোক্তাদের ঠকানোর অভিযোগও নিয়মিত উঠছে।
ভোক্তা অধিদপ্তরের বাজার অভিযানে এসব অনিয়ম ধরা পড়লেও সারাদেশে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জনবল সংকটকে এর বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গতকাল বিশ্বব্যাপি পালিত হলো ‘বিশ্ব পরিমাপ দিবস’। এই দিনকে সামনে রেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিমাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে ভোক্তাদের প্রতারণা থেকে রক্ষা করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে তারা বাজারে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিমাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও লাভবান হবে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, ওজন ও পরিমাপ সঠিক রাখার জন্য সরকার ২০১৮ সালে ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনে কাঁচা বাটখারা ব্যবহারের সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে বিএসটিআই এবং ভোক্তা অধিদপ্তরের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে এবং অবৈধভাবে ওজন কম দেওয়া বিক্রেতাদের এড়িয়ে চলতে হবে। বিক্রেতাদেরও আইন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে প্রকৃত ওজনের চেয়ে কম দিলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তার মতে, সব খাতে সঠিক পরিমাপ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক বলেন, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সবকিছুই নির্ভর করছে নির্ভুল পরিমাপের ওপর—বাজার থেকে কেনাকাটা, জ্বালানি গ্রহণ, এমনকি চিকিৎসা ও বড় অবকাঠামো প্রকল্প পর্যন্ত।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রে তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়নের জন্য নির্ভরযোগ্য পরিমাপ ব্যবস্থা অপরিহার্য। জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, বায়ুর মান নির্ধারণ এবং ওষুধের সঠিক মাত্রা নির্ধারণে নির্ভুল পরিমাপ না থাকলে কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। একইভাবে ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় রাখতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিএসটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্প ও বাণিজ্য নীতিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিমাপ পদ্ধতি রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। কৃষি খাতে সার, কীটনাশক ও পানির সঠিক পরিমাপ উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিমাপের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। একই সঙ্গে মেট্রিক পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক একক পদ্ধতি বাস্তবায়নেও কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে ২০১০ সালে সাতটি আধুনিক পরীক্ষাগার নিয়ে জাতীয় মেট্রোলজি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়, যা পরিমাপের মান নির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে।
এ ছাড়া বিভিন্ন পরিমাপ যন্ত্রের পরীক্ষা ও নির্ভুলতা যাচাই সেবা দেওয়া হয়। বিএসটিআই বলছে, একটি শক্তিশালী জাতীয় মান অবকাঠামো শিল্প উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ভোক্তা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্ব পরিমাপ দিবসকে সামনে রেখে প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এক সময় পৃথিবীতে অভিন্ন পরিমাপ ব্যবস্থা ছিল না। ১৭৯৫ সালের দিকে শুধু ফ্রান্সেই ৭০০টির বেশি ভিন্ন একক প্রচলিত ছিল। এতে বাণিজ্যে বিভ্রান্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জটিলতা এবং শিল্প উৎপাদনে অসামঞ্জস্য তৈরি হতো।
বাণিজ্যে একই পণ্যের ওজন বিভিন্ন বাজারে ভিন্ন হওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে আস্থাহীনতা ও বিরোধ তৈরি হতো। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ফলাফল তুলনা করা কঠিন হয়ে পড়ত। আর শিল্প বিপ্লবের সময়ে সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ তৈরিতেও বাধা সৃষ্টি হতো।

