দেশব্যাপী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী চলমান মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানেও মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না। অভিযান শুরু হওয়ার ১৭ দিন পার হলেও মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের সাফল্য এখনও সীমিত। বিশেষ করে শীর্ষ পর্যায়ের গডফাদারদের গ্রেপ্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকায় পুরো অভিযান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অভিযানের শুরুতে কয়েকটি বড় চালান আটক হলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কার্যক্রমের গতি কিছুটা কমে এসেছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল। সেই সুযোগে মাদক কারবারিরা নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করে, যার প্রভাব এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
বর্তমানে দেশের সীমান্তবর্তী ২৯টি জেলার ১৬২টি পয়েন্ট দিয়ে মাদক প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের সরবরাহ বাড়ছে বলে জানা গেছে। এতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার আরও উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে।
পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, অভিযান আরও জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মাদকের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। সীমান্তে নজরদারি আরও কঠোর করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে শুরু থেকেই কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্কে অন্তত ১৬০০ গডফাদার সক্রিয় রয়েছে। পুরো দেশে মাদক ব্যবসার এই চক্র তিনটি স্তরে পরিচালিত হচ্ছে। এতে প্রায় ২১ হাজারের মতো কারবারি জড়িত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে এদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।
সূত্র বলছে, এখন মাদক পাচারে নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছদ্মবেশে কার্যক্রম পরিচালনা, যা শনাক্ত করা আরও কঠিন করে তুলেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব না হলে এসব কারবারির অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে মাদকের বাজার আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর নীতির বাস্তবায়ন ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তিনি সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারির পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) মো. বশির আহমেদ বলেন, বিশেষ অভিযান শুরুর পর থেকে সারাদেশে ধারাবাহিকভাবে অভিযান চলছে। ইতোমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়েছে। তিনি দাবি করেন, জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে কাজ চলমান।
অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়) এ কে এম শওকত ইসলাম জানান, লাইসেন্সপ্রাপ্ত বারগুলোতেও অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সিসা লাউঞ্জ বন্ধ করা হয়েছে এবং ঢাকামুখী মাদক পরিবহনের পথে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অভিযান শুরুর পর মাদক বিক্রেতা ও বাহক পর্যায়ের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গডফাদারদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই বড় ধরনের গ্রেপ্তার অভিযান সফল হবে।
সরবরাহ বাড়ছে যেসব মাদকের:
দেশে মাদক সরবরাহ ও জব্দের পরিসংখ্যান বলছে, সামগ্রিকভাবে মাদকের প্রবাহ ও ধরন দুই–ই বাড়ছে। বিশেষ করে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিলের পাশাপাশি নতুন ধরনের মাদকও এখন বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারা দেশে ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। তবে গত বছরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১ পিসে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া গত বছর ১৬৬ কেজি হেরোইন, সাড়ে ১৪ কেজি কোকেন, ৯৬ হাজার ৩৫৭ কেজি গাঁজা, ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৪০ বোতল এবং ৮১ লিটার ফেনসিডিল জব্দ করা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে ২ কেজি ৮৪৭ গ্রাম আইস, ৭০ কেজি সিসা, সাড়ে ৬ কেজি কেটামিন, ৫ দশমিক ৪৬ কেজি গাঁজার কুশ এবং ১ লাখ ২০ হাজার ৭৫৪ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটও উদ্ধার করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কেটামিন, ট্যাপেন্টাডল ও গাঁজার কুশের মতো কিছু মাদক দুই–তিন বছর আগেও তেমনভাবে বাজারে দেখা যেত না। এখন এসব নতুন ধরনের মাদকের উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে, যা মাদক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এ ছাড়া তথ্য বলছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রচলিত কিছু মাদকও এখন দেশে প্রবেশ করছে এবং তা বিশেষ করে ধনাঢ্য পরিবারের তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা ভবিষ্যতে মাদকের ধরন ও বিস্তারকে আরও বৈচিত্র্যময় ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
কোন পথে কী ধরনের মাদক ঢুকছে:
দেশের প্রায় সব সীমান্তবর্তী পথই এখন মাদক প্রবেশের ঝুঁকিপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন চক্র সীমান্তের ফাঁক গলে মাদকের চালান দেশের ভেতরে পাঠাচ্ছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এতে রোহিঙ্গা চক্রের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। কক্সবাজার অঞ্চলে ইয়াবার পাশাপাশি হেরোইনের প্রবাহও বেড়েছে।
সূত্র অনুযায়ী, ফেনসিডিল প্রবেশ করছে দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ময়মনসিংহ, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তপথ দিয়ে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার এবং আসামের ধুবরী ও দক্ষিণ সালমারা মানকাচর জেলার রুট ব্যবহার করে এসব মাদক আনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
গাঁজার প্রবাহও একইভাবে বিস্তৃত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নওগাঁ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে গাঁজা দেশে ঢুকছে। ভারতের আসামের ধুবরী ও করিমগঞ্জ, কোচবিহার, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং ত্রিপুরার আগরতলা সীমান্তকেও এই প্রবাহের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশি মদ প্রবেশ করছে সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুর সীমান্তপথ দিয়ে।
চট্টগ্রাম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর চট্টগ্রামের ১১ জেলা ও নগরীতে মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে পড়া, সোর্স নেটওয়ার্ক ভেঙে যাওয়া এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের সুযোগে মাদক চক্র আরও সক্রিয় হয়েছে বলে মাঠপর্যায়ের একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
সূত্রগুলো বলছে, এই সময়ে নিয়মিত চেকপোস্ট ও বিশেষ অভিযান অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ বা সীমিত ছিল। এতে কারবারিরা রুট পরিবর্তন করে নির্বিঘ্নে চালান পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে কিছু ক্ষেত্রে মাদক মামলা কমার চিত্র দেখা গেলেও বাস্তবে মাদকের বিস্তার বেড়েছে বলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা দাবি করছেন।
বগুড়া থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক সময়ের তুলনায় গত সময়ে জেলায় মাদক কারবার ও সেবন বেড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা মাদক কারবারিদের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলা সীমান্তবর্তী হওয়ায় সেখানেও মাদক প্রবেশ ও কেনাবেচার তৎপরতা বেশি বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এই দুই উপজেলায় মাদক সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম আরও সক্রিয় হয়েছে।
নড়াইল প্রতিনিধি জানান, প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল থাকায় জেলায় মাদক কেনাবেচা ও সেবনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত ১৮ মাসে এ হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় মাদক কারবারিরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, কুয়াকাটা উপকূল এখন মাদক কারবারিদের কাছে একটি নিরাপদ রুট বা ‘সেফ জোন’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সমুদ্রপথে নিয়মিতভাবে কুয়াকাটা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় মাদক প্রবেশ করছে, যা পরে স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রি হয়ে আবার নৌ ও সড়কপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার হচ্ছে। চোলাই মদ, গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবার পাশাপাশি এখানে ক্রিস্টাল মেথ নামের নতুন এক ধরনের মাদকও পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্সের মাধ্যমে মাদক চক্র থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের বিষয়ও উঠে এসেছে। এতে অভিযানের আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতা বা বহনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও দুর্বল সাক্ষ্য-প্রমাণের কারণে অনেকেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে গডফাদাররা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে অভিযানের সময় ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক পরিবহনে শিশু ও নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, জেলায় এখন অনেক জায়গাতেই সহজে মাদক পাওয়া যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। রাস্তার ধারে ও হাটবাজারেও মাদক বিক্রির ঘটনা ঘটছে বলে দাবি তাদের। স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা, জনবল সংকট এবং সংঘবদ্ধ চক্রের সক্রিয়তার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর ফলে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে আসক্তি বাড়ছে এবং চুরি ও ছিনতাইসহ অপরাধও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে তারা জানান।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগে সীমান্ত দিয়ে ব্যাপকভাবে মাদক প্রবেশ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঝেমধ্যে বহনকারীরা ধরা পড়লেও মূল গডফাদাররা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। ফলে রংপুর অঞ্চল ক্রমেই মাদক পাচারের একটি নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। এতে অভিভাবক ও সচেতন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
সিভি/এম

