দেশের পথশিশুদের বড় একটি অংশ এখনো জন্মনিবন্ধনের বাইরে রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ পথশিশুর কোনো জন্মসনদ নেই। একই সঙ্গে জন্মসনদ না থাকা এসব শিশুর মধ্যে ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের পিতামাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরও জানে না।
গতকাল বুধবার ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক মিডিয়া পরামর্শ সভায় এসব তথ্য তুলে ধরে কারিতাস বাংলাদেশ। সভায় শিশু জন্মের পরপরই হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি পথশিশু ও অতিদরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য শর্তযুক্ত শিশু ভাতা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক থিওফিল নকরেক। তিনি বলেন, সরকারের ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় হলেও পরিবারহীন কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুরা এখনো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। এসব শিশু রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, ফুটপাত, বাজার ও বস্তিতে বড় হচ্ছে।
সভায় আরও বলা হয়, জন্মসনদ না থাকা শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়। এটি একটি মানবাধিকার সংকটও। জন্মনিবন্ধন না থাকলে শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, সরকারি ভাতা পাওয়া এবং ভবিষ্যতে নাগরিক অধিকার ভোগে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়। রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট ৮৩ লাখ ৬০ হাজার ৩৩৩ জনের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। তবে এর মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জন্মের পরপরই হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সরাসরি জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ওয়ার্ডভিত্তিক বিশেষ ও মোবাইল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
সভায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় মাসিক ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকার ভাতাকে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে অপ্রতুল বলে উল্লেখ করা হয়। এজন্য পথশিশু ও অতিদরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য শর্তযুক্ত শিশু ভাতা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, শিশুকে স্কুলে পাঠানো, শিশুশ্রমে না জড়ানো এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার শর্তে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
সভায় উপস্থিত পথশিশু প্রতিনিধিরা তাদের দৈনন্দিন দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা মেলে না। জন্মসনদ না থাকায় স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি অনেকেই। ফলে অনেক শিশু কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
কারিতাস বাংলাদেশের এসডব্লিউভিসি সেক্টরের ইনচার্জ চন্দ্র মনি চাকমা বলেন, একটি শিশুকে পথে নামানোর পেছনে সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা রয়েছে। তাই পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সভায় কুসুম গ্রেগরি, অসীম ক্রুজ, আশ্বনী প্রিন্স গমেজসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, পথশিশু প্রতিনিধি ও অভিভাবকরা উপস্থিত ছিলেন।

