প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান এখনও দেখা যাচ্ছে না। বরং পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করছে। একদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে, অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। একইসঙ্গে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে জীবনযাত্রার অবনতি এবং প্রত্যাবাসনের আশা প্রায় নিভে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘ ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো বুধবার ২০২৬ সালের জন্য নতুন যৌথ মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই পরিকল্পনার আওতায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, আগের বছরের তুলনায় এই সহায়তার পরিমাণ আরও কমানো হয়েছে।
২০২৫ সালের সংশোধিত পরিকল্পনার তুলনায় এবারের তহবিল আবেদন প্রায় ২৬ শতাংশ কম। জাতিসংঘ নিজেই বলছে, এটি কেবল ন্যূনতম মানবিক সহায়তা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ। অর্থাৎ বাস্তব চাহিদা এর চেয়েও অনেক বেশি।
বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ মানুষ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সহিংসতা থেকে পালিয়ে এসেছে। ফলে শুধু শরণার্থী নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠী মিলিয়ে এখন প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের জন্য সহায়তা প্রয়োজন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক সহায়তা উল্টো কমছে। গত কয়েক বছরে অগ্নিকাণ্ড, ঘূর্ণিঝড়, রোগব্যাধি ও নতুন করে শরণার্থী আগমনের পরও রোহিঙ্গা সহায়তা তহবিল ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
২০২৫ সালে প্রথমে ১০১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা কমিয়ে ৯৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নামানো হয়। এবার সেই পরিমাণ আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলারে।
এই সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে শিবিরগুলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, পয়ঃনিষ্কাশন, আশ্রয়, নিরাপত্তা ও জীবিকা—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে।
শুধু খাদ্য নিরাপত্তার জন্যই ২০২৬ সালে প্রয়োজন প্রায় ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। আশ্রয় ও ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের জন্য দরকার ৬ কোটি ১২ লাখ ডলার। শিক্ষা খাতে প্রয়োজন ৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রায় ৫ কোটি ডলার।
কিন্তু পরিকল্পনা ঘোষণার সময় পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ২৯ কোটি ১০ লাখ ডলার। আরও প্রায় ১৪ কোটি ৫৯ লাখ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখনও প্রায় ২৬ কোটি ডলারের ঘাটতি রয়ে গেছে।
সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা খাত। এই খাতে অর্থের ঘাটতি প্রায় ৬৮ শতাংশ। জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে ঘাটতি ৬২ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ৫৩ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রায় অর্ধেক অর্থের ঘাটতি রয়েছে।
মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, এই পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ শিবিরের বেশিরভাগ পরিবার পুরোপুরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবার শুধু খাদ্য সহায়তার ওপর বেঁচে আছে। মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ অস্থায়ী কাজের সুযোগ পাচ্ছে।
এর আগেও তহবিল সংকট ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ২০২৩ সালে অর্থের অভাবে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা মাথাপিছু ১০ ডলার থেকে কমিয়ে ৮ ডলারে নামানো হয়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কিছুটা পুনর্বহাল করা হয়। সেই অভিজ্ঞতা এখনও শরণার্থীদের মনে আতঙ্ক তৈরি করে।
এদিকে জলবায়ু ঝুঁকি, অতিবৃষ্টি, ভূমিধস, ঘূর্ণিঝড় এবং সামাজিক অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শুধু শরণার্থী শিবির নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বহন করতে করতে কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারাও ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।
যদিও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রায় ৩ কোটি ৬১ লাখ ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তবুও অনেকের মতে এটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর থেকে অগ্নিকাণ্ড, করোনা মহামারি, ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’, বন্যা ও তহবিল সংকট—একটির পর একটি দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়েছে শরণার্থীদের।
কিন্তু এত বছর পরও প্রত্যাবাসনের কোনো কার্যকর অগ্রগতি নেই। বাংলাদেশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, “প্রত্যাবাসনের কোনো আশা এখনও দেখা যাচ্ছে না। বরং আন্তর্জাতিক সহায়তার এই সংকেত বলছে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।”
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির শীর্ষ কর্মকর্তা রানিয়া দাগাশ-কামারা বলেছেন, রোহিঙ্গারা নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরতে চায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংকট ভুলে যেতে পারে না।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার উপ-হাইকমিশনার কেলি টি ক্লেমেন্টসও সতর্ক করে বলেছেন, অর্থ সংকোচনের প্রভাব এখন বাস্তবভাবে দেখা যাচ্ছে। শুধু দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, হতাশা বাড়তে থাকায় অনেক রোহিঙ্গা এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে পালানোর চেষ্টা করছে। জাতিসংঘ বলছে, ২০২৫ সাল রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী নৌযাত্রার বছরে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ২৭০ জনের বেশি যাত্রী বহনকারী একটি নৌকা ডুবে মাত্র ৯ জন বেঁচে ফিরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু মানবিক ইস্যু নয়; এটি ধীরে ধীরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার বড় চ্যালেঞ্জে রূপ নিচ্ছে। আর আন্তর্জাতিক সহায়তা যদি এভাবে কমতেই থাকে, তাহলে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

