দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে কন্যাশিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এতে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং নানা প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। আর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
সর্বশেষ ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে খণ্ডবিখণ্ড করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতিবেশী সোহেল রানাকে জড়িত বলা হয়েছে। এর আগে গত ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে ১০ বছরের এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পরিবারের এক আত্মীয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সাম্প্রতিক পাঁচটি ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব অপরাধে ভুক্তভোগী শিশুরা প্রায়ই প্রতিবেশী, আত্মীয় বা পরিচিতজনের কাছেই শিকার হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী, আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব ঘটনার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত অপরাধপ্রবণতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ও দায়ী। তাঁদের মতে, মাদকাসক্তির বিস্তার, অনলাইন মাধ্যমে বিকৃত কনটেন্টের সহজপ্রাপ্যতা, পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। এ সময়ে ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে।
শুধু চলতি মাসের ১ থেকে ২০ মে পর্যন্ত ২৪ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময়ে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১২ শিশু এবং ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় ১১৫ শিশু খুন হয়েছে বলেও তথ্য রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৫ হাজার ৯৫৮টি মামলা হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবে গত বছর ২ হাজার ৮০৮ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়। এর মধ্যে কন্যাশিশু ছিল ১ হাজার ২৩৪ জন। নারী ১ হাজার ৫৭৪ জন। এ সময় ৫৪৩ কন্যাশিশু ও ২৪৩ নারী ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণের পর ১৮ কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়। ধর্ষণের শিকার হয়ে পাঁচ শিশু আত্মহত্যা করে এবং ১৪৭ কন্যাশিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়।
জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইনে শিশু যৌন হয়রানি সংক্রান্ত ৫ হাজার ৮৫৩টি কল এসেছে। এর মধ্যে ৫২০টি কল ছিল ধর্ষণের ঘটনায়। হেল্পলাইনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছরই এ ধরনের অভিযোগ বাড়ছে।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের ঘটনায় জানা যায়, মা ও বড় বোন সকালে কাজে গেলে ১০ বছরের শিশুটি বাসায় একা ছিল। এ সময় এক আত্মীয় তাকে ধর্ষণ করে। পরে ঘটনাটি জানিয়ে দেওয়ার ভয় দেখালে শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, সমাজে দীর্ঘদিনের অবক্ষয় ও দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কারণে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। তাঁর মতে, অপরাধীরা মনে করে ভুক্তভোগীকে হত্যা করলে প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির ঝুঁকি কমে যায়। মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। তিনি বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্র ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ বলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে আইন যথেষ্ট থাকলেও মূল সমস্যা এর সঠিক প্রয়োগে। তদন্তের দুর্বলতা, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে অনেক মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে অনেক আসামি খালাস পেয়ে যায় বা মামলা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। তিনি আরও বলেন, বিচারকের সংখ্যা ও মামলার চাপের ভারসাম্য না থাকায় বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে, যা ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিশুরা তুলনামূলকভাবে দুর্বল লক্ষ্যবস্তু। নিরাপত্তা ঘাটতির সুযোগে অপরাধীরা তাদের শিকার করে। তাঁর মতে, মানুষের ভেতরে মানবিক ও পাশবিক দুই প্রবৃত্তিই থাকে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ভেঙে গেলে পাশবিক প্রবৃত্তি প্রাধান্য পায়। একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে তা অন্যদের মধ্যেও অপরাধপ্রবণতা বাড়াতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনপরিসর—কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়। তাঁর মতে, এটি কেবল অপরাধ নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক সংকটের প্রতিফলন। তিনি দ্রুত বিচার, কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানান।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, অপরাধী শনাক্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

