জন্ম থেকে মৃত্যু—মানুষের জীবনচক্র জুড়ে ঘুষ যেন এক অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। জন্মসনদ, মৃত্যু সনদ কিংবা ওয়ারিশ সনদসহ মৌলিক নাগরিক সেবার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্ধারিত ফির বাইরে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ফলে রাষ্ট্রীয় সেবা গ্রহণ এখন অনেকের জন্যই ভোগান্তির আরেক নাম।
একটি শিশুর জন্মের পর তার প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে যে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়, সেটি তুলতেই পড়তে হয় নানা জটিলতায়। সরকারি ফি নামমাত্র হলেও দালালচক্র এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কয়েকগুণ বেশি টাকা খরচ করতে হয়। একই চিত্র দেখা যায় মৃত্যুসনদ কিংবা ওয়ারিশ সনদ নেওয়ার ক্ষেত্রেও। টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না—এমন একটি অঘোষিত ব্যবস্থা এখন এসব সেবাখাতে দৃশ্যমান।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যারা এই ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান থাকলেও বাস্তবে ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ঘুষ ও চাঁদাবাজি বন্ধে সরকারের দৃঢ় বার্তা প্রয়োজন। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এই অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তার মতে, প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে অনিয়ম আরও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, পাসপোর্ট কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন বা নতুন করে করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হন। সামান্য ভুল ধরিয়ে দিয়ে দিনের পর দিন ঘোরানো হয় সেবাগ্রহীতাদের। শেষ পর্যন্ত দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া কাজ সম্পন্ন হয় না।
যাত্রাবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সরেজমিনে দেখা যায়, সেবাগ্রহীতারা দালাল ছাড়া আবেদন জমা দিতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়ছেন। একাধিক আবেদন সংশোধন করেও অনেক সময় তা গ্রহণ করা হয় না বলে অভিযোগ করেন উপস্থিত কয়েকজন। এতে বাধ্য হয়ে অনেকে দালালের শরণাপন্ন হন।
একজন দালাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাধারণ সমস্যার সমাধানে সরকারি ফির বাইরে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। আর বড় ধরনের সংশোধন বা জন্মতারিখ পরিবর্তনসহ জটিল কাজের ক্ষেত্রে পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার কথাও স্বীকার করেন তিনি।
এ সময় কদমতলী এলাকা থেকে আসা এক সেবাগ্রহীতার আবেদন শুরুতে গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা যায়। পরে তিনি অফিসের প্রধান ফটকের সামনে এক দালালকে দুই হাজার টাকা দেন। এরপর আবার লাইনে দাঁড়িয়ে তার আবেদন জমা দিতে সক্ষম হন এবং শেষ পর্যন্ত সেবা পেয়ে স্বস্তি নিয়ে ফিরে যান।
পাসপোর্ট অফিসের পর এবার সরকারি হাসপাতাল, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়সহ নানা দপ্তরে অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বেড বরাদ্দ থেকে শুরু করে পরীক্ষা, অপারেশনের সিরিয়াল কিংবা অ্যাম্বুলেন্স সেবাতেও বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন রোগীরা।
সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে গিয়ে অনেকেই ওয়ার্ডবয়ের মাধ্যমে টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। না দিলে বেড পাওয়া যায় না বলেও দাবি রোগী ও স্বজনদের। একইভাবে আইসিইউ সেবা পাওয়া এখন অনেকের কাছে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করছেন ভুক্তভোগীরা।
অন্যদিকে ভূমি রেজিস্ট্রি, সাব-রেজিস্ট্রি ও ভূমি অফিসগুলোতেও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসছে। জমির নামজারি, খতিয়ান সংশোধন কিংবা দলিল নিবন্ধনের মতো কাজে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। জমি কেনাবেচা বা নামজারির মতো প্রক্রিয়ায় ঘুষ ছাড়া ফাইল এগোচ্ছে না—এমন অভিযোগও রয়েছে।
গত সোমবার তেজগাঁও ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে যান খিলগাঁওয়ের গোড়ান এলাকার মোহাম্মদ আলী। তিনি জানান, সরকারি ফি ছাড়াও তার কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। পরে তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় দরকষাকষি করে বাড়তি অর্থ দিয়েই কাজ সম্পন্ন করতে হয়।
এদিকে জন্মনিবন্ধনের মতো মৌলিক সেবাও অনিয়মের বাইরে নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলোর অনেক জায়গায় নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে বলেও অভিযোগ করেন অনেকে।
ঢাকার মিরবাগের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন জানান, তিনি তার ছেলের জন্মনিবন্ধনের জন্য গত ১৪ মে মহাখালী ঢাকা উত্তর সিটির আঞ্চলিক অফিসে আবেদন করেন। নিয়ম অনুযায়ী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে সনদ পাওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। পরে তিনি সাইফুল নামের এক কম্পিউটার দোকানির মাধ্যমে এক হাজার দুইশ টাকা দিয়ে এক দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করেন। আরেক ভুক্তভোগী রফিকুল বলেন, জন্মনিবন্ধনের জন্য তাকে কয়েকবার অফিসে যেতে হয়েছে। পরে দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার পরই কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মহাখালী আঞ্চলিক অফিসে সেবা নিতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সুরাইয়া বেগম। তিনি বলেন, “জন্ম থেকে শুরু করে মরার পরও যে শান্তি নেই, তা এই অফিসে না এলে বুঝতাম না। সামান্য একটা ভুলের জন্য তিন মাস ধরে ঘুরছি। শেষ পর্যন্ত দালালের হাতে বাড়তি টাকা দেওয়ার পর কাজটা হলো।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নাগরিক সেবা পেতে ঘুষ বাণিজ্য বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, “এখনো যদি পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হয়, তাহলে এত শহীদের আত্মত্যাগ তো বৃথা হয়ে যাবে।”
এদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-তে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া কিংবা নতুন গাড়ির নিবন্ধন নেওয়াকে ঘুষ ছাড়া প্রায় অসম্ভব বলে অভিযোগ রয়েছে। বারবার সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঘুষ বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। একই চিত্র দেখা যায় ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি এবং ভূমি নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়াতেও। নির্ধারিত ফি দেওয়ার পরও নানা অজুহাতে হয়রানির শিকার হতে হয় সেবাগ্রহীতাদের।
শুধু এসব সেবাই নয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও সহায়তা খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অবিবাহিত, বিপত্নীক বা বিধবা সনদপত্র, ভূমিহীন ও দুস্থদের তালিকা প্রণয়ন, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যক্ত ও অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার আবেদন প্রক্রিয়াতেও ঘুষের অভিযোগ পাওয়া যায়।
একইভাবে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ ও কাবিখা কার্ড সেবা, জমির পর্চা বা খতিয়ান উত্তোলন, ই-নামজারি ও জমাভাগ আবেদনেও অতিরিক্ত অর্থের অভিযোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য ঋণ সহায়তা, যৌতুক ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পরামর্শসহ বিভিন্ন সেবাও এই অনিয়মের বাইরে নয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। অনেক ক্ষেত্রেই ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না, কিংবা দীর্ঘসূত্রতার মাধ্যমে ভোগান্তি বাড়ে বলে দাবি তাদের।
সিভি/এম

