আগামী বাজেটে অর্থ পাচারকারীদের জন্য আবারও বিশেষ সুবিধা বা সাধারণ ক্ষমা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বাইরে পাচার হওয়া অর্থ কোনো প্রশ্ন ছাড়াই দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা অর্থ যদি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে বিনিয়োগ করা হয়—বিশেষ করে উৎপাদনশীল শিল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে—তাহলে ওই অর্থের উৎস নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলা হবে না। তবে এই অর্থে করহার স্বাভাবিক করব্যবস্থার তুলনায় কিছুটা বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা। তিনি বলেন, “বিদেশ থেকে আনা অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে সাধারণ ক্ষমার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করা।” তিনি আরও জানান, এই সুযোগ শুধু পাচার হওয়া অর্থের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে বৈধভাবে অর্জিত সম্পদও এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি শ্বেতপত্র অনুযায়ী, বিগত সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এর আগে ২০২২–২৩ অর্থবছরে তৎকালীন সরকার ৭ থেকে ১৫ শতাংশ কর পরিশোধের মাধ্যমে বিদেশে থাকা সম্পদ বৈধ করার সুযোগ দিয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি। পরবর্তী বাজেটে সেই সুবিধা আর রাখা হয়নি। আগামী ১১ জুন সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের একজন সাবেক সভাপতি এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশে আটকে আছে, যা ২৮ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। তার মতে, পাচার হওয়া অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পেলে তা কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে গতি আনতে পারে।
অন্যদিকে, আরেক ব্যবসায়ী নেতা মনে করেন, পাচার হওয়া অর্থ বিনা প্রশ্নে ফেরত আনার সুযোগ না দিয়ে বরং পুঁজি পাচার রোধে জোর দেওয়া উচিত। তার মতে, অতীতে দেখা গেছে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই বেশি জরুরি, যাতে অর্থ দেশ থেকে বাইরে না যায়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক বলেন, সরকার যদি সত্যিই পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেয়, তাহলে তা ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে। তিনি বলেন, অনেক দেশে এমন ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে বিকল্প পদ্ধতিতে বিদেশে থাকা অর্থ দেশে আনা হয়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্দিষ্ট মানদণ্ড, বাড়তি করহার এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

