বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে গিয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটছে। সম্প্রতি একটি বড় প্রতিষ্ঠানে প্রায় আট হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা এসেছে। এর মধ্যেই নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র—চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই বিশ্ব প্রযুক্তি খাতে চাকরি হারিয়েছেন এক লাখেরও বেশি কর্মী। এ তথ্য প্রকাশ করেছে দ্য ন্যাশন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টা এবং চাকরি ছাঁটাই পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট লেঅফস ডট এফওয়াইআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নতুন করে বড় আকারে ছাঁটাই শুরু করেছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে খরচ কমানো, ব্যবসায়িক কাঠামো পুনর্গঠন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বাড়তি বিনিয়োগ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রযুক্তিখাতে ছাঁটাইয়ের গতি কিছুটা কমলেও চলতি বছরে তা আবার বেড়ে গেছে। মে মাসের শুরু পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে এক লাখের বেশি প্রযুক্তি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে প্রতিযোগিতা দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মূলধন ও জনবল কাঠামো নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই সবচেয়ে বেশি ছাঁটাই হয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে প্রায় ৮১ হাজার ৭০০ প্রযুক্তি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। ২০২৩ সালের পর এটিই কোনো এক প্রান্তিকে সর্বোচ্চ ছাঁটাই। এরপর দ্বিতীয় প্রান্তিকের এপ্রিল থেকে জুনের প্রথম ছয় সপ্তাহেই বিশ্বজুড়ে আরও প্রায় ২০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের শিকার হন। এই প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
গত বছর প্রতি প্রান্তিকে গড়ে প্রায় ২৭ হাজার থেকে ৩৭ হাজার কর্মী ছাঁটাই হলেও ২০২৪ সালের শেষ দিকে সেই চাপ কিছুটা কমে আসে। তবে চলতি বছরে পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মেটা ছাড়াও পেপ্যাল এবং ক্লাউডফ্লেয়ার সাম্প্রতিক সময়ে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে।
চলতি মাসে প্রায় ছয় হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় মাইক্রোসফট। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যয় কমানোর অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে মোট জনবলের তিন শতাংশের কম কর্মী প্রভাবিত হবেন। ২০২৩ সালের পর এটিই তাদের সবচেয়ে বড় ছাঁটাই।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বড় বিনিয়োগের কারণে অনেক কাজ এখন স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে আগের মতো বড় কর্মীসংখ্যা ধরে রাখার প্রয়োজনও কমে আসছে।
সর্বশেষ বড় ঘোষণা এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটার কাছ থেকে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তাদের বৈশ্বিক কর্মীবাহিনীর প্রায় ১০ শতাংশ কমানো হবে। এতে প্রায় আট হাজার কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
এদিকে অনেক দেশেই এখন শ্রমনির্ভর কাজের বদলে ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে কম জনবলেই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। তবে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান ভিন্ন মত দিয়েছেন। তার মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত কারণ আড়াল করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৯০ শতাংশ নির্বাহী জানিয়েছেন, আগামী তিন বছরে কর্মসংস্থানের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি।

