বাংলাদেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট খাতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে সহজ করা, অনিয়ন্ত্রিত অপারেটরদের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা এবং ইন্টারনেট সেবার গতি ও মান উন্নত করা।
নীতিনির্ধারকদের মতে, এই সংস্কারের মাধ্যমে খাতটি আরও আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব হবে। একই সঙ্গে সেবার গুণগত মানেও আসবে দৃশ্যমান উন্নতি। বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার লাইসেন্স চার স্তরে পরিচালিত হচ্ছে—জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। নতুন পরিকল্পনায় এই কাঠামো কমিয়ে মাত্র দুই স্তরে আনার প্রস্তাব রয়েছে—জাতীয় ও জেলা পর্যায়। এতে বিভাগীয় ও উপজেলা পর্যায়ের অপারেটরদের নতুন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
সরকারি হিসাবে বর্তমানে দেশে প্রায় ২,৫০০টি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার লাইসেন্স রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আগের সরকারের শেষ সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩,০০০-এর কাছাকাছি পৌঁছায়। এতে বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে এবং সেবার মানেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। তখন বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ড (বর্তমান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড) ডায়াল-আপ সেবা চালু করে।
২০০০ সালের শুরুতে বেসরকারি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। ২০০৪ সালের মধ্যে শহরাঞ্চলে সাইবার ক্যাফের বিস্তার ঘটে। এরপর ইথারনেট সংযোগের মাধ্যমে বাসা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে শুরু করে এসব প্রতিষ্ঠান। ২০০৬ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া–মধ্যপ্রাচ্য–পশ্চিম ইউরোপ-৪ সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর ইন্টারনেটের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। তবে সবচেয়ে বড় বিস্তার ঘটে কোভিড-১৯ মহামারির সময়। মাত্র এক বছরে গ্রাহক সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটিরও বেশি হয়। এতে রিমোট কাজ, অনলাইন শিক্ষা ও ডিজিটাল সেবার চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরো খাতে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, গ্রাহক সেবা কর্মী এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীরা রয়েছেন। দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৪৮ লাখ ব্রডব্যান্ড সংযোগ থাকলেও বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। ধারণা করা হয়, প্রায় ৯০ লাখ সংযোগের মাধ্যমে ৩ কোটির বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।
খাত নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন একটি ‘রিসেলার’ মডেল চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন। এই মডেলে লাইসেন্সবিহীন অপারেটররা পূর্ণ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার লাইসেন্স ছাড়াই নিবন্ধনের মাধ্যমে সেবা বিক্রি করতে পারবে। তবে তারা নিজেরা লাইসেন্সধারী হবে না, বরং বিদ্যমান লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারের সেবা পুনর্বিক্রয় করবে।
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থায় নতুন কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন হবে না, শুধু সেবার পুনর্বিক্রয়ের সুযোগ থাকবে।
এই প্রস্তাবকে ঘিরে খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি আমিনুল হাকিম মনে করেন, রিসেলার মডেল চালু হলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এবং অনিয়ন্ত্রিত অপারেটররা বাজার দখল করে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
তার মতে, এতে সেবার মান কমে যেতে পারে এবং গ্রামীণ এলাকায় মূল্য ও সেবার ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য টিকে থাকাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব ও জবাবদিহি পরিষ্কার না হলে রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানিয়েছেন, বর্তমানে অনেক ছোট ও অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার বড় অপারেটরদের অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে সেবা দিচ্ছে। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা গেলে বাজারে নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়বে। এতে পুরো খাত আরও স্বচ্ছ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ হবে।
সরকারের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ব্রডব্যান্ড খাতকে আধুনিক করা, সেবার গতি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে ইন্টারনেট গতি ১ জিবিপিএস পর্যন্ত পৌঁছানোর লক্ষ্যও রয়েছে, যা বিশ্বের উন্নত অনেক দেশেই ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।

