বাংলাদেশে শিক্ষার পথ এখন আর শুধু বই, শ্রেণিকক্ষ বা পরীক্ষার ফলাফলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রমেই হয়ে উঠছে পরিবারের আয়, সামাজিক অবস্থান, নিরাপত্তা, আস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়-আশার হিসাব। কোন সন্তান কোন প্রতিষ্ঠানে পড়বে—সরকারি বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম, আলিয়া মাদ্রাসা নাকি কওমি মাদ্রাসা—এই সিদ্ধান্তের পেছনে এখন ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখছে।
অনেক পরিবার আজ এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সন্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়া মানে কেবল পাঠ্যক্রম বেছে নেওয়া নয়; বরং মাসিক খরচ, খাবার, আবাসন, দেখভাল, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজা। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারকে শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো ছবিটি বোঝা যায় না। এর গভীরে রয়েছে শিক্ষার ব্যয়, সরকারি শিক্ষার ওপর কমে যাওয়া আস্থা এবং বেসরকারি শিক্ষার ক্রমবর্ধমান খরচ।
বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা একরকম নয়। আলিয়া মাদ্রাসাগুলো এখন অনেক শিক্ষার্থীর কাছে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয়, কারণ সেখানে সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষা যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসা বহু দরিদ্র পরিবারের জন্য এমন এক প্রতিষ্ঠান, যেখানে কম খরচে সন্তান পড়াশোনা করতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে খাবার ও আবাসনের সুবিধাও পায়। অর্থাৎ, এই শিক্ষাপ্রবাহের পেছনে বিশ্বাস যেমন আছে, তেমনি আছে টিকে থাকার কঠিন বাস্তবতা।
২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ২০১৯ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৮.০৬ লাখ, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০.২ লাখে। একই সময়ে কওমি মাদ্রাসা বোর্ডে শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ১ লাখ। এই পরিসংখ্যান শুধু মাদ্রাসার জনপ্রিয়তা দেখায় না; এটি দেখায় পরিবারগুলো কোন বাস্তবতার কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
একজন কর্মজীবী মায়ের উদাহরণ এই বাস্তবতাকে আরও পরিষ্কার করে। তিনি সকালে বাড়ি থেকে বের হন, সন্ধ্যায় ফেরেন, সন্তানের দেখভালের জন্য ঘরে কেউ নেই। তাই কাছের একটি মাদ্রাসাই তার কাছে হয়ে ওঠে পড়াশোনা, খাবার ও তত্ত্বাবধানের একসঙ্গে পাওয়া জায়গা। এই ঘটনা ব্যক্তিগত মনে হলেও আসলে এটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্ন তোলে—কেন একটি পরিবারের শিক্ষার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকা ও নিরাপত্তার সিদ্ধান্তে পরিণত হচ্ছে?
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওপর আস্থা কমে যাওয়ার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী ২০২২ সালে প্রায় ২.০৫ কোটি থেকে ২০২৩ সালে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৯৭ কোটিতে। শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই কমেছে ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। একই সময়ে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ৪৬ লাখ থেকে প্রায় ৪৮.৭ লাখে। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক সংকট এবং কওমি মাদ্রাসার দিকে ঝোঁক—দুই বিষয়ই এই পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখছে।
এই চিত্র বাংলাদেশে শিক্ষার ভেতরের শ্রেণিভাগকে স্পষ্ট করে। উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার সন্তানের জন্য ইংরেজি মাধ্যম বেছে নেয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত পরিবার ঝোঁকে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের দিকে। আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার খোঁজে এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে খরচ কম, খাবার পাওয়া যায়, এবং সন্তান অন্তত নজরদারির মধ্যে থাকে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল জ্ঞানের জায়গা নয়; এটি হয়ে উঠছে শ্রেণিগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অদৃশ্য সিঁড়ি।
এখানে মাদ্রাসা শিক্ষাকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ধর্মীয় শিক্ষার ঐতিহ্য দীর্ঘ এবং গভীর। বহু মাদ্রাসা শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবন, প্রশাসন ও সামাজিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে পাঠ্যক্রম হালনাগাদ, কম্পিউটার ল্যাব, বিজ্ঞান ল্যাব এবং উচ্চশিক্ষার পথ তৈরি করার উদ্যোগও দেখা যায়। যদি একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, আরবি, নৈতিকতা, প্রযুক্তি জ্ঞান, যোগাযোগ দক্ষতা, আর্থিক জ্ঞান ও নাগরিক দায়িত্ব শিখতে পারে, তাহলে সমাজই লাভবান হবে।
সমস্যা মাদ্রাসা নয়; সমস্যা হলো অসম ভবিষ্যৎ। কোনো শিক্ষাব্যবস্থাই ভালো নয়, যদি সেখানে মুখস্থবিদ্যা থাকে কিন্তু বোঝার ক্ষমতা না থাকে, ধর্মীয় নিষ্ঠা থাকে কিন্তু কর্মদক্ষতা না থাকে, আধুনিকতার কথা থাকে কিন্তু নৈতিকতা না থাকে, অথবা সনদ থাকে কিন্তু বাস্তব দক্ষতা না থাকে। তাই প্রশ্নটি মাদ্রাসা বনাম বিদ্যালয় নয়; প্রশ্নটি হলো—সব ধারার শিক্ষার্থী কি সমান মানের মৌলিক শিক্ষা পাচ্ছে?
ইউনেসকোর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রের অগ্রগতির একটি বড় ছবি পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ১৯৯০ সালের ৩৪ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৯০ শতাংশে উঠেছে। নিম্ন-মাধ্যমিক সম্পন্ন করার হারও ১৯৯০ সালের ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৭৪ শতাংশ হয়েছে। এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু বিদ্যালয় শেষ করলেই শিক্ষার লক্ষ্য পূরণ হয় না। শিক্ষার্থী কতটা শিখল, কতটা দক্ষ হলো, কাজের বাজারের জন্য কতটা প্রস্তুত হলো—এসব প্রশ্নও সমান জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের ২৭ শতাংশ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। সংখ্যায় এটি প্রায় ১.২৬ কোটি মানুষ। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ নারী, যাদের বড় অংশ গ্রামীণ এলাকা থেকে এসেছে। এই তথ্য ভয়াবহ, কারণ আমরা একদিকে জনমিতিক সুবিধার কথা বলছি, অন্যদিকে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের বাইরে পড়ে আছে। ২০৪০ সালের দিকে এই জনমিতিক সুযোগের জানালা সংকুচিত হতে পারে। অর্থাৎ আজ যে শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, সে বড় হবে এমন এক সময়ে, যখন দক্ষতার অভাব জাতীয় উন্নয়নের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই বাংলাদেশের শিক্ষাসংস্কারের কেন্দ্রে একটি নীতি থাকা দরকার—শিক্ষাপ্রবাহ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মৌলিক শিক্ষার অধিকার ভিন্ন হতে পারে না। কওমি মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি ভার্সন বা ইংরেজি মাধ্যম—যেখানেই পড়ুক, প্রতিটি শিশুর সাক্ষরতা, গণিতজ্ঞান, বিজ্ঞানচেতনা, প্রযুক্তি দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, নাগরিক নৈতিকতা এবং ভবিষ্যৎ কাজের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আবার আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এর জন্য দরকার শিক্ষকের জবাবদিহি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, পুষ্টিকর খাবার, অভিভাবকের অংশগ্রহণ, প্রযুক্তিনির্ভর সহায়তা এবং শিক্ষার ফলাফল নিয়ে সৎ মূল্যায়ন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান যেন বাধ্য হয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানে যায়, আর ধনী পরিবারের সন্তান যেন আলাদা ভবিষ্যৎ কিনে নেয়—এমন শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য বিপজ্জনক।
মাদ্রাসা আধুনিকীকরণকেও সাংস্কৃতিক সংশোধন হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি হতে হবে শিক্ষাগত ন্যায়ের অংশ। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতি অবজ্ঞা নয়, দরকার সুযোগ, অবকাঠামো, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শেখার পরিবেশ, কারিগরি শিক্ষার সেতুবন্ধন এবং উচ্চশিক্ষার পরিষ্কার পথ। একই সঙ্গে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্তিসংগত জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্র যদি দরিদ্রের শিক্ষাকে কঠোরভাবে দেখে, কিন্তু ধনীদের শিক্ষাবাজারকে প্রশ্নহীনভাবে ছাড় দেয়, তবে বৈষম্য আরও বাড়বে।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের ১০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকেও একটি বিষয় স্পষ্ট—উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা থেকে শুরু হয় না। তার ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে। শিশু যদি শুরুতেই দুর্বল শিক্ষা, অনিরাপদ পরিবেশ বা অসম সুযোগের মধ্যে বড় হয়, তবে পরে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে সেই ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হয়ে যায়।
বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার বৃদ্ধি তাই শুধু ধর্মীয় প্রবণতার বিষয় নয়। এটি শিক্ষার ব্যয়, সরকারি ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা, বেসরকারি শিক্ষার চাপ, কর্মজীবী পরিবারের বাস্তব সংকট এবং শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষাবাজারের একটি লক্ষণ। যখন শিক্ষা দরিদ্রের জন্য ব্যয়বহুল, মধ্যবিত্তের জন্য চাপের এবং রাষ্ট্রের জন্য অসম হয়ে পড়ে, তখন মাদ্রাসার প্রসারকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায় না। বরং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের গভীর অসাম্যকে সামনে আনে।
সবশেষে প্রশ্নটি খুব সহজ কিন্তু কঠিন: বাংলাদেশ কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে পারবে, যেখানে ধর্মীয়, সাধারণ, কারিগরি বা ইংরেজি—যে ধারার শিক্ষাই হোক না কেন, প্রতিটি শিশু সমান মর্যাদা ও সমান ভবিষ্যতের অধিকার পাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলাদেশকে নির্ধারণ করবে।

