যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলসহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বড় প্রকল্প ব্যয় এবং রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপে পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসেবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে শুধু ঋণ পরিশোধেই দেশের ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৩০.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
একসময় সরকারি ব্যয়ের একটি অংশ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার হলেও সেটি রাজস্ব উদ্বৃত্ত থেকেই নির্বাহ করা সম্ভব হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন উন্নয়ন ব্যয় তো বটেই, দৈনন্দিন প্রশাসনিক ব্যয়ও ধার করা অর্থ দিয়ে চালাতে হচ্ছে। এটি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে ২০২২–২৩ অর্থবছর থেকে ঘাটতি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ওই সময়ে শুধুমাত্র পরিচালন ব্যয় মেটাতেই প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় রাজস্ব আয় ৪৬৩ কোটি টাকা কম ছিল। সেই ঘাটতি পূরণ করা হয় ঋণ নিয়ে। পরের বছর সেই ঘাটতির পরিমাণ আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬৩০ কোটি টাকায়। আর ২০২৪–২৫ অর্থবছরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পুরো অর্থই ঋণের মাধ্যমে জোগান দিতে হয়।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ, বাজেটের আকার দ্রুত বৃদ্ধি এবং সেই অনুপাতে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে না পারা—এই তিনটি বিষয় মিলেই অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকায় সরকারকে ধার-নির্ভর অর্থায়নের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৮.৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪১ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণের চাপ আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতির কারণে দেশটির ঋণ ঝুঁকির শ্রেণিবিন্যাসও পরিবর্তিত হয়েছে। আগের তুলনায় এখন বাংলাদেশকে নিম্ন ঝুঁকির বদলে মধ্যম ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। মূলত ঋণের পরিমাণ, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং রপ্তানি ও রাজস্ব আয়ের অনুপাত দুর্বল হয়ে পড়ায় এই পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ঋণ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া। শুধু আসল ও সুদ মিলিয়ে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সরকারকে প্রায় ৩০.৫৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে। এর আগের অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ২৬.৬৩ বিলিয়ন ডলার, আর পরবর্তী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এটি আরও বেড়ে ৩৩.৮৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর বড় অংশই এসেছে উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণ থেকে, যা আগের বছরগুলোতে নেওয়া হয়েছিল। অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে গিয়ে এসব ঋণ নেওয়া হয়। এখন সেগুলোর পরিশোধ শুরু হওয়ায় চাপ আরও বেড়েছে।
এই ঋণ নির্ভরতা দেশের আর্থিক স্বাধীনতাকেও সীমিত করছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়লেও সেটি ব্যাংকিং খাতে চাপ সৃষ্টি করছে। ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ধার নেওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আরও সতর্ক করে বলেছে, রাজস্ব আয় না বাড়ালে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো সাত শতাংশের নিচে, যা অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম কম। ফলে সরকারের হাতে নতুন ঋণ পরিশোধ বা বাজেট ব্যবস্থাপনার সুযোগ সীমিত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে শুধু বাজেট নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে রাজস্ব প্রশাসন, ব্যাংকিং খাতের শাসনব্যবস্থা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কার না আনলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টার পর্যবেক্ষণেও একই ধরনের সতর্কবার্তা রয়েছে। তার মতে, ঋণ পরিশোধের গতি এখন রপ্তানি ও রাজস্ব আয়ের চেয়েও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলতে পারে। তাই নতুন করে উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, উন্নয়ন এবং ব্যয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গিয়ে বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে রাজস্ব আয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

