বিশ্বজুড়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রভাব থেকে জ্বালানি বাজার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা জোরালো হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে। এই জলপথটি দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল, যার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
সোমবার (২৫ মে) এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় পাঁচ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৩৬ মার্কিন ডলারে নেমে আসে। একই সময় মার্কিন বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট তেলের দাম কমে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ৫০ ডলারে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় একদিনের দরপতন।
বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বাড়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে চলমান সমঝোতা প্রক্রিয়ার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক ইতিমধ্যেই একে অপরের কাছাকাছি এসেছে। সম্ভাব্য চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুট বন্ধ বা সীমিত থাকলে সরাসরি বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
এখন সেই অনিশ্চয়তা কমে আসার ইঙ্গিত পাওয়ায় শুধু জ্বালানি নয়, শেয়ারবাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন প্রধান সূচকে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাপানের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক নিক্কেই দুইশ পঁচিশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ইতিহাসে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারেও বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্পোন্নত দেশগুলো, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি অনুভব করছে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যেও অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, সম্ভাব্য চুক্তির অধিকাংশ বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যেই সমঝোতা হয়েছে এবং শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সময় নিয়ে এগোনো উচিত।
ইরানের পক্ষ থেকেও মিশ্র ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও সব বিরোধ এখনো সমাধান হয়নি। ফলে চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। একদিকে যুদ্ধ ও উত্তেজনার ঝুঁকি কমার সম্ভাবনা, অন্যদিকে জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়া কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে আসন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তব চুক্তির ওপর।

