গত এক দশকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় এই খাত নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আশার আলো দেখালেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিনিয়োগ সংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জের কারণে স্টার্টআপগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশে স্টার্টআপ বিনিয়োগ সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছালেও পরবর্তী বছরগুলোতে তা হ্রাস পেয়েছে। এই প্রতিবেদনটিতে বর্তমান স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বিশ্লেষণ, বিনিয়োগ প্রবণতা, চ্যালেঞ্জ এবং টিকে থাকার কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করার প্রয়াস চালানো হয়েছে।
স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগের ধারা ও বর্তমান পরিস্থিতি: লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে প্রায় ৯৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এসেছে, যার মধ্যে ৯২% বিদেশি বিনিয়োগ। ২০২১ সালে এই খাতে সর্বোচ্চ ৪৩৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়, যা পরের বছর ২০২২ সালে কমে দাঁড়ায় ১২৫ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারে। ২০২৩ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ আরও হ্রাস পেয়ে ৭২ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে তা আরও কমে ৩৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
এই নিম্নমুখী বিনিয়োগ প্রবণতা বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর জন্য বড় একটি সংকেত। যদিও কয়েকটি বড় স্টার্টআপ যেমন: পাঠাও, শপআপ, ইজিয়ার এবং ডেলিভারি টাইগার এখনও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন স্টার্টআপগুলোর জন্য বিনিয়োগ সংগ্রহ করা ক্রমশই কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিনিয়োগ হ্রাসের কারণ-
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা: কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে কম আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বাজারে অর্থ রাখতে আগ্রহী হচ্ছে।
স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন: আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বাংলাদেশি টাকার মান হ্রাস পাওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা কম লাভজনক হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (VC) ফার্মগুলো নতুন বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের দক্ষতার ঘাটতি: অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসার মূল ধারণা (Business Model) ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা দক্ষতার অভাব রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা শুধুমাত্র টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন ব্যবসাগুলোতে বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক স্টার্টআপের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পরিকল্পনা নেই।
নীতিমালার জটিলতা: বাংলাদেশে এখনও স্টার্টআপবান্ধব কোনো বিশেষ নীতিমালা নেই। কর ব্যবস্থা, লাইসেন্সিং, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাঁধা এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে উদ্যোক্তারা ব্যবসা পরিচালনায় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।
স্থানীয় বিনিয়োগের ঘাটতি: বাংলাদেশে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সহজে লাভজনক এবং বিনিয়োগে ঝুঁকি কম এমন ক্ষেত্রগুলো যেমন: জমি, রিয়েল এস্টেট ও ট্রেড ব্যবসায় বেশি বিনিয়োগ করতে চান। স্টার্টআপ খাতে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করার মানসিকতা এখনো তৈরি হয়নি। ফলে স্থানীয় ফান্ডিং উৎস সীমিত।
চ্যালেঞ্জসমূহ-
বাজারের সীমাবদ্ধতা: স্টার্টআপগুলোর জন্য প্রধান বাঁধা হলো বাজারের আকার। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বাড়লেও ডিজিটাল অর্থনীতি এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে অনেক স্টার্টআপ টেকসই লাভজনকতা অর্জনে ব্যর্থ হয়।
দক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানবসম্পদের অভাব:
প্রযুক্তি ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জনবল পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে সফটওয়্যার ডেভেলপার, পণ্য ব্যবস্থাপক এবং স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানারদের অভাব প্রকট।
কর কাঠামোর জটিলতা: বাংলাদেশে করের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, যা স্টার্টআপগুলোর জন্য একটি বড় বাঁধা। এছাড়া বিভিন্ন লাইসেন্স ফি ও সরকারি ফরমালিটিগুলো পরিচালনা করতেও অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় হয়।

টিকে থাকার কৌশল-
বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন: সরকারের উচিত স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ কর সুবিধা প্রদান করা, বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা তৈরি করা এবং এগুলো বাস্তবায়নে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কর ছাড় এবং সহজ নিয়ম চালু করেছে। বাংলাদেশেও এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া অতীব জরুরি।
স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা:
বাংলাদেশের ধনী শ্রেণি ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মধ্যে স্টার্টআপ বিনিয়োগের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এই জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ সম্মেলন এবং অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে, যাতে বিনিয়োগে উৎসাহী হয়।
স্টার্টআপ এক্সিলারেটর ও ইনকিউবেটর বৃদ্ধি:
বাংলাদেশে স্টার্টআপদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও বেশি ইনকিউবেটর ও এক্সিলারেটর প্রোগ্রাম চালু করা দরকার। এসব প্রোগ্রাম চালু হলে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, নেটওয়ার্কিং এবং প্রাথমিক বিনিয়োগ পেতে সহায়তা করবে।
উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা মডেলের ওপর জোর দেওয়া: বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীরা এখন গভীর প্রযুক্তি (Deep Tech), এআই (AI), ফিনটেক (Fintech) এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তির (HealthTech) মতো খাতে বেশি বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশে এসব খাতে নতুন স্টার্টআপ তৈরি করা গেলে বিনিয়োগ আকর্ষণ সহজ হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি:
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ফান্ডিং সুবিধা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হলে তারা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে। ফলে নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম বর্তমানে একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে সঠিক নীতি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে এটি পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা, দক্ষ জনবল তৈরি, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্তকরণ এবং উদ্ভাবনী ব্যবসা মডেল তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী স্টার্টআপ সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব। যদি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে একটি সুসংগঠিত ও লাভজনক স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

