জুনের প্রথম সপ্তাহে সংসদে উপস্থাপন হওয়ার কথা আছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। প্রাথমিক কাঠামো অনুযায়ী আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, ঘাটতি ৫ শতাংশের কাছাকাছি। বাজেটের আকার বড় হলেও বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু সহজ না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা কম আদায় করেছে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঘাটতি। আর সুদ পরিশোধেই যাচ্ছে বাজেটের প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এই প্রেক্ষাপটে শুধু বাজেটের আকার বাড়ালেই উন্নয়ন হবে এমনটা বলা কঠিন।
তাহলে কোন পাঁচটি বিষয়ে এবারের বাজেট সত্যিকারের মনোযোগ দিলে পরিবর্তন আসতে পারে? সরেজমিনে ঘুরে এবং তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে যা বুঝেছি তা এখানে বিশদভাবে বলছি।
০১. দুর্নীতি ও কালো টাকা: সমস্যাটা কাঠামোগত। রাজশাহীর একটি সরকারি প্রকল্পে গিয়ে দেখেছিলাম, ঠিকাদার কাগজে সড়ক তৈরির কাজ শেষ দেখিয়েছেন, মাঠে তখনো মাটি কাটা শুরু হয়নি। এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০.৩ শতাংশ, যা ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। টাকা বরাদ্দ আছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না, এর একটাই মানে, মাঝের পথে টাকা আটকে যাচ্ছে।
কালো টাকার প্রশ্নে বাংলাদেশ বারবার সাধারণ ক্ষমার পথ বেছেছে। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং কর ফাঁকিকে পুরস্কৃত করে। সমাধান কী হতে পারে? সব সরকারি কেনাকাটায় ই-প্রকিউরমেন্ট বাধ্যতামূলক, প্রতিটি বড় প্রকল্পে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা এবং সরকারি ব্যয়ের রিয়েলটাইম পাবলিক ড্যাশবোর্ড চালু করা। ব্যক্তিগত সম্পদ ঘোষণার আওতা বাড়িয়ে উচ্চ আয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল লেনদেন ট্র্যাকিং শক্তিশালী করলে কালো টাকার উৎসেই চাপ তৈরি হবে।
৮৭ লাখের বেশি প্রবাসীদের বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন, কিন্তু তাদের বড় অংশ এখনো নিম্নদক্ষতার কাজে। ফলে প্রতিজনের আয় কম, ঝুঁকি বেশি। বাজেটে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ালে একজন কর্মী যেখানে আগে মাসে ৩০০ ডলার পাঠাতেন, দক্ষ হলে পাঠাতে পারবেন ৭০০ থেকে ৮০০ ডলার।
০২. রেমিট্যান্স: সুখবর আছে, কিন্তু গভীর দুর্বলতাও আছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে মোট ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে বড় খবর। তবে এর পেছনে একটা কারণ আছে যেটা নীতিনির্ধারকদের মাথায় রাখা দরকার, হুন্ডি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনার কারণে অনেকটা প্রবাহ আনুষ্ঠানিক পথে এসেছে।
আমার মতে, এই সুযোগটা ধরে রাখতে হবে কৌশলগতভাবে। ৮৭ লাখের বেশি প্রবাসীদের বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন, কিন্তু তাদের বড় অংশ এখনো নিম্নদক্ষতার কাজে। ফলে প্রতিজনের আয় কম, ঝুঁকি বেশি। বাজেটে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ালে একজন কর্মী যেখানে আগে মাসে ৩০০ ডলার পাঠাতেন, দক্ষ হলে পাঠাতে পারবেন ৭০০ থেকে ৮০০ ডলার। একই সংখ্যক প্রবাসী থেকে রেমিট্যান্স দ্বিগুণ হওয়ার পথ এটাই।
০৩. মুদ্রাস্ফীতি: শুধু সংকোচন নীতিতে কাজ হবে না। টানা ২৭ মাস নয় শতাংশের ওপরে থেকে মুদ্রাস্ফীতি এখন কিছুটা নিচে নেমেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে এখনো স্বস্তি নেই। নারায়ণগঞ্জের এক গার্মেন্টকর্মী জানাচ্ছিলেন, বেতন বাড়েনি, কিন্তু চালের দাম বেড়েছে, ভাড়া বেড়েছে, সন্তানের স্কুলের খরচ বেড়েছে।
সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতি নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এতে বেসরকারি বিনিয়োগের ঋণ ব্যয় বেড়েছে, উৎপাদন কমেছে, মানুষের আয় আরও চাপে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমুখী অবস্থান দরকার, কিন্তু বাজেটেও সরবরাহ পক্ষের ব্যবস্থা নিতে হবে।
কৃষিতে সেচ ও বীজ ভর্তুকি বৃদ্ধি, স্থানীয় বাজারে পণ্য পরিবহনে সড়ক ও সেতু সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং ডিজিটাল বাজার মনিটরিং চালু করলে সরবরাহ বাড়বে এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমবে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা কমাতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
০৪. বিনিয়োগ: শুধু পরিসংখ্যান বাড়ালেই বিনিয়োগ বাড়বে না। বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে গত মাসে অফিসের কাজে সাভারে গিয়ে সেখানে একজন উদ্যোক্তার সাথে আলাপ হয়েছিল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপনের অনুমতি পেতে লেগেছে এক বছরের বেশি। ততদিনে মূলধনের সুদ-খরচ মিলিয়ে উনার কয়েক লাখ টাকা ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল।
চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০.৩ শতাংশ, কারণ প্রকল্পের অনুমোদন আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই। বাজেটে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে কর সুবিধার চেয়ে বেশি জরুরি অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা। একক জানালা বিনিয়োগ সেবা, নির্দিষ্ট সময়সীমায় অনুমতি না পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদন এবং নতুন কর্মী নিয়োগে কর ছাড়ের ব্যবস্থা করলে বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগকারী দুই পক্ষই উৎসাহিত হবেন। এগ্রো-প্রসেসিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি সেবা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা এখনো অব্যবহৃত।
০৫. রাজস্ব: হার বাড়ানো নয়, আওতা বাড়ানো। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং সবচেয়ে বড় সুযোগ। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ার গড় ১৩-১৪ শতাংশ। আইএমএফের সাথে চলমান ঋণ কর্মসূচির অন্যতম শর্ত ছিল কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি আটকে আছে।
নিবন্ধিত করদাতাদের একটি বড় অংশ নিয়মিত রিটার্ন দেন না। কর অব্যাহতি ও ছাড়ের মোট পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৬.৫ শতাংশ, অথচ মোট কর আদায় মাত্র ৮ শতাংশ। মানে প্রায় সমান। এই ক্ষমা ও ছাড়ের তালিকা যদি নিরীক্ষা করে অপ্রয়োজনীয়গুলো বাদ দেওয়া যায়, কর প্রশাসনে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতি চালু এবং উচ্চ সম্পদের ক্ষেত্রে কার্যকর করারোপ করা যায়, তাহলে কর হার না বাড়িয়েও রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি সম্ভব। সাধারণ মানুষের ওপর আর একটুও বোঝা না চাপিয়ে।
পাঁচটি সমস্যাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটির প্রভাব অন্যটির ওপর পড়ছে। দুর্নীতি কমলে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়বে, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে। রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী হলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমবে। আবার রাজস্ব আদায় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে সরকারের ব্যয় সক্ষমতাও বাড়বে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী হলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমবে। আবার রাজস্ব আদায় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে সরকারের ব্যয় সক্ষমতাও বাড়বে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব কাঠামো, কম বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এই বাস্তবতায় শুধু বড় আকারের বাজেট ঘোষণা যথেষ্ট নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই বাজেট কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।
তাই এবারের বাজেটে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিত। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং করের আওতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দেওয়া গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
লেখক: শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

