দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু ব্যয় এখনও উদ্বেগজনকভাবে কম। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্য আয়ের বহু পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে। এই বাস্তবতায় আগামী জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু ন্যূনতম ১০০ ডলার বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)।
সংগঠনটি একই সঙ্গে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, অসংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে কার্যকর করতে এই উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ‘জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব দাবি তুলে ধরেন এনডিএফ নেতারা। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যখাতের বাজেট, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ, স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য, অর্থায়নের সংকট এবং টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা।
এনডিএফ সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেনের সঞ্চালনায় বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও গবেষক ডা. মো. মিজানুর রহমান।
তার গবেষণাভিত্তিক উপস্থাপনায় উঠে আসে, বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, এ খাতে অন্তত ৫ শতাংশ ব্যয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ছে।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য বরাদ্দ ৫০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো স্বাস্থ্যখাতে তুলনামূলক অনেক বেশি ব্যয় করছে। মালদ্বীপে মাথাপিছু স্বাস্থ্য বরাদ্দ ১০০০ থেকে ১২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই ব্যয় ১০ থেকে ১২ হাজার ডলারের মধ্যে।
তাদের মতে, কম বরাদ্দের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, জেলা পর্যায়ে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, আইসিইউ ও আধুনিক চিকিৎসাসেবার অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডা. এম এ সবুর, ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. শাদরুল আলম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ডা. দিদারে আলম মহসিন, গবেষক ডা. কাজী তাসলিমা, গবেষক নাজমুল হাসান ও সাংবাদিক হামীম উল কবির আলোচনায় অংশ নেন।
বক্তারা থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা, শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশেও জনবান্ধব ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
তারা স্বাস্থ্যখাতে ধাপে ধাপে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে আইসিইউ, এনআইসিইউ, ডায়ালাইসিস, ক্যানসার ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র সম্প্রসারণের আহ্বান জানান। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ প্রণোদনার কথাও বলেন তারা। এছাড়া ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড এবং টেলিমেডিসিন সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংসদ সদস্য সাবেকুন নাহার বলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পরও স্বাস্থ্যখাত এখনও অবহেলিত। তার ভাষায়, দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাবে এ খাতে বড় ধরনের লুটপাট হয়েছে। তাই স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সভাপতি অধ্যাপক ডা. সাদরুল আলম বলেন, স্বাস্থ্যবিমা চালু করা গেলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেউদ্দীন ফরিদ বলেন, প্রতিবছর স্বাস্থ্যখাতের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা অব্যবহৃত থেকে ফেরত যায়। তার মতে, বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় স্বাস্থ্যখাতের সংকট আরও বাড়ছে। তিনি বলেন, কাগজে-কলমে চিকিৎসক ও নার্স থাকলেও বাস্তবে অনেক স্থানে জনবল পাওয়া যায় না। তাই সমস্যার মূল জায়গায় হাত দিয়ে কার্যকর সমাধানের দিকে যেতে হবে।
এনডিএফের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ডা. একেএম ওয়ালিউল্লাহ বলেন, হাসপাতালে যন্ত্রপাতি থাকলেও তা ব্যবহারের মতো দক্ষ জনবল অনেক জায়গায় নেই। আবার বিদ্যমান জনবলকেও সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি মেডিকেল কলেজের মতো বেসরকারি মেডিকেল কলেজেও বেসিক সাবজেক্টে অধ্যয়নরতদের জন্য বিশেষ ভাতা চালু করা প্রয়োজন। এতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে। পাশাপাশি নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিদ্যমান কলেজগুলোর শিক্ষার মান ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, ডা. আতিয়ার রহমান, ডা. রুহুল কুদ্দুস বিপ্লব, ডা. একেএম জিয়াউল হক, ন্যাশনাল নার্সেস ফোরামের সভাপতি ইউনুস আলীসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকরা।

