ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আকস্মিক ও গোপনীয় আবুধাবি সফর মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে নতুন করে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সফরের সময়, অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের পরিচয় এবং বৈঠকের গোপনীয়তা দেখে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন- এর পেছনে শুধু নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনা নয়, বরং আরও স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয় থাকতে পারে।
এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে সম্ভাব্য সতর্কবার্তা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরের পক্ষ থেকে হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব দাবির সত্যতা, সতর্কবার্তার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু এবং তা নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে পেয়েছিলেন কি না- এসব বিষয়ে এখনো প্রকাশ্য ও পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ নেই। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এসব প্রতিবেদন অস্বীকার করেছে।
সতর্কবার্তার বিতর্কে চাপে নেতানিয়াহু
৭ অক্টোবরের হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় নিয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে।
ফলে নির্বাচনের আগে যদি এমন কোনো ধারণা তৈরি হয় যে সরকার আগাম সতর্কতা পেয়েও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি, তাহলে তা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আবুধাবি সফরের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, নেতানিয়াহু হয়তো চাননি, কোনো ঘনিষ্ঠ আরব মিত্র প্রকাশ্যে এমন কোনো বক্তব্য দিক যা তার রাজনৈতিক বিরোধীদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিতে পারে।
বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির পর ইসরায়েলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরব অংশীদারে পরিণত হয়েছে। ফলে আবুধাবির কোনো বক্তব্য শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, আছে বড় নিরাপত্তা হিসাব
তবে নেতানিয়াহুর সফরকে শুধুমাত্র “মুখ বন্ধ করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা” হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতায় ইসরায়েল ও আমিরাতের সম্পর্কের পেছনে আরও বড় নিরাপত্তাগত হিসাব রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, হুতি বিদ্রোহীদের কার্যক্রম, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা- এসব বিষয় দুই দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবুধাবি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
ইসরায়েলের দৃষ্টিতে আমিরাত শুধু একটি কূটনৈতিক অংশীদার নয়, বরং ইরানবিরোধী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই মোসাদ প্রধানসহ ইসরায়েলের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, বৈঠকে কৌশলগত নিরাপত্তা বিষয় বড় ভূমিকা রেখেছে।
আমিরাতের কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থান।
একদিকে আবুধাবি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে আরব বিশ্বের জনমত, ফিলিস্তিন ইস্যু এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা আমিরাতের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে সরাসরি জড়িয়ে পড়া থেকে তারা দূরে থাকতে চাইতে পারে।
যদি সত্যিই নেতানিয়াহু আমিরাতের নেতৃত্বের কাছে কোনো প্রতিবেদন বা বক্তব্য অস্বীকার করার অনুরোধ করে থাকেন, তাহলে সেটি হবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ আরব রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ভারসাম্যের সংঘর্ষ।
একটি গোপন সফর, বহু প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফর কি শুধুই নিরাপত্তা বৈঠক ছিল, নাকি ৭ অক্টোবরের আগাম সতর্কতা সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ন্ত্রণের একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা?
বর্তমান প্রকাশ্য তথ্য দিয়ে নিশ্চিতভাবে কোনো একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। তবে সফরের সময়, গোপনীয়তা এবং অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় ইঙ্গিত দেয় যে আলোচনায় শুধু সাধারণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় ছিল না।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই ঘটনা একটি বড় বাস্তবতা তুলে ধরে- মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এখন শুধু প্রকাশ্য কূটনীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয় না; বরং গোপন বৈঠক, গোয়েন্দা যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা সমঝোতাও বড় ভূমিকা রাখে।
ইসরায়েল, আমিরাত, সৌদি আরব, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র- সব পক্ষই নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থ, আঞ্চলিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
সুতরাং নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফরকে একদিকে যেমন ৭ অক্টোবরের আগাম সতর্কতা বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এটি ইরান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন শক্তির ভারসাম্যের অংশ হিসেবেও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য হয়তো ভবিষ্যতে আরও পরিষ্কার হবে। তবে এটুকু স্পষ্ট- এই ছোট সময়ের গোপন সফর মধ্যপ্রাচ্যের বড় কূটনৈতিক সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।

