ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের যুদ্ধ যেন আবার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। ২০২২ সালের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর দেশটিতে বড় ধরনের সহিংসতা কিছুটা কমলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখন ইরান-সমর্থিত আনসার আল্লাহ, যারা সাধারণত হুথি নামে পরিচিত, তাদের দখলে থাকা অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। পাল্টা হিসেবে হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। ফলে ইয়েমেন আবারও মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রশাদ আল-আলিমি রবিবার ঘোষণা করেছেন, হুথি নিয়ন্ত্রিত সমস্ত অঞ্চল পুনরুদ্ধারের জন্য সামরিক অভিযান শুরু করা হবে। তিনি বলেন, লক্ষ্য হলো দেশের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুথিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে ইয়েমেনকে মুক্ত করা। আল-আলিমি বলেন, “এই সন্ত্রাসী মিলিশিয়াদের কবল থেকে দেশ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত” এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
রশাদ আল-আলিমির ঘোষণার পর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও বড় আকার ধারণ করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ হুথিরা গত এক দশকে শুধু একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং উত্তর ইয়েমেনে একটি শক্তিশালী সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট নতুন মাত্রা পায়। বর্তমানে ইয়েমেনের মোট ভূখণ্ডের বড় অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দেশটির সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলগুলো তাদের হাতে রয়েছে। ইয়েমেনের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাস করে।
নতুন সামরিক অভিযান ও হুথিদের পাল্টা জবাব
ইয়েমেন সরকারের সামরিক অভিযানের ঘোষণার পর উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। হুথি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সৌদি বাহিনী গত ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৫০টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনাগুলোর একটি, রিয়াদের কাছাকাছি এলাকায় হামলার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও এসব হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো সীমিত, তবে এই ধরনের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। কারণ অতীতেও হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করেছে।
হুথিদের উত্থান: বিদ্রোহী গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক শক্তি
হুথি আন্দোলনের উত্থান ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত। উত্তর ইয়েমেনের জাইদি শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠনে পরিণত হয়।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর হুথিরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এর পর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে।
সৌদি আরবের লক্ষ্য ছিল হুথিদের সামরিকভাবে দুর্বল করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু প্রায় এক দশকের যুদ্ধের পরও হুথিদের সম্পূর্ণ পরাজিত করা সম্ভব হয়নি।
বরং হুথিরা অসম যুদ্ধ কৌশল ব্যবহার করে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং উপকূলীয় সামরিক সক্ষমতার মাধ্যমে তারা শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেছে।
ছোট জলপথের বড় ভূ-রাজনীতি
ইয়েমেন সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালী।
আফ্রিকার জিবুতি ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহন এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
গত মাসে হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা দখল করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে তারা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথের ওপর আরও বেশি কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে।
লোহিত সাগরে হুথিদের সামরিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হতে পারে।
সৌদি আরবের জন্য বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা শুধু সামরিক বিষয় নয়; এটি দেশটির তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
ইয়েমেন যুদ্ধ: সৌদি-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছায়া
ইয়েমেনের সংঘাতকে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করলে এই সংঘাত আন্তর্জাতিক মাত্রা পায়। সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করে।
অন্যদিকে ইরান হুথিদের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করে, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইরানি প্রযুক্তি ও সহযোগিতার ভূমিকা রয়েছে।
তবে ইয়েমেনের বাস্তবতা শুধুমাত্র সৌদি-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হুথিদের নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিও রয়েছে, যা উত্তর ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই কারণে ইয়েমেনের যুদ্ধ একই সঙ্গে একটি গৃহযুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন।
সৌদি আরবের সামনে বড় পরীক্ষা
হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল পুনরুদ্ধারে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের নতুন সামরিক অভিযান সৌদি আরবের জন্য বড় ধরনের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরবের প্রধান লক্ষ্য ছিল হুথিদের সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে শক্তিশালী করা। কিন্তু প্রায় এক দশকের সংঘাতের পরও হুথিদের পুরোপুরি পরাজিত করা সম্ভব হয়নি।
বরং হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ২০১৯ সালের সৌদি আরামকোর আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলা। ওই হামলার পর সৌদি আরবের তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাপকভাবে কমে যায় এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলা করা। দ্বিতীয়ত, আবারও দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে আটকে না পড়া।
কারণ সৌদি আরব একই সময়ে অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য Vision 2030 বাস্তবায়নে কাজ করছে। দেশটির নেতৃত্বের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ইয়েমেন যুদ্ধ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের কৌশল কী?
ইয়েমেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন পর্যায়ে সামরিক সহায়তা দিয়ে এসেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এশিয়া টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুতে খবর প্রকাশিত হয় যে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে অনুরোধ করেছিলেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি বড় আকারের বিমান হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে দূরে সরে নেই। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সরাসরি যুদ্ধের বাইরে থেকে মূলত- গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি সক্ষমতা, সামরিক বিশ্লেষণ এবং লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের পেছনে বড় কারণ হলো, ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে চাইছে। ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন সীমিত সম্পৃক্ততার কৌশল অনুসরণ করছে।
তবে হুথিদের বাব আল-মান্দেবের কাছাকাছি অবস্থান, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব- এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সৌদি আরবের সামরিক প্রস্তুতি: নতুন বড় সংঘাতের আশঙ্কা
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেন সরকার প্রায় এক লাখ সৈন্য মোতায়েন করতে পারে, যা ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর অন্যতম বৃহত্তম সামরিক সমাবেশ।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ইয়েমেনে আট বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়েছিল। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করতে পারেনি।
বর্তমান সামরিক অভিযান যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ইয়েমেন আবারও পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের দিকে ফিরে যেতে পারে। একই সঙ্গে এটি সৌদি আরব, ইরান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার কারা?
ইয়েমেন যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য দিয়েছে সাধারণ মানুষ।
ইয়েমেন যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের শেষ নাগাদ যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে প্রায় ৩ লাখ ৭৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর বড় অংশ ঘটেছে ক্ষুধা, রোগ, স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়া এবং অর্থনৈতিক পতনের কারণে। এই মৃত্যুর মধ্যে আনুমানিক ২ লাখ ৫৯ হাজার ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
যুদ্ধ ইয়েমেনের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে।
বর্তমানেও ইয়েমেন বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকটের মুখে রয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ২২ লাখ শিশু অপুষ্টির সমস্যায় ভুগছে।
নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে খাদ্য সরবরাহ, চিকিৎসা সহায়তা এবং মানবিক কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
নতুন সংঘাতে মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা
সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আগেই ইয়েমেন নতুন করে মানবিক সংকটের মুখে পড়েছিল।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) জানিয়েছে, নতুন করে সংঘাত ও অস্থিরতার কারণে ১ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) সতর্ক করেছে, যুদ্ধের কারণে খাদ্য সরবরাহের পথ ব্যাহত হলে প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ ইয়েমেনবাসী তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইয়েমেনে ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট চলছে। নতুন যুদ্ধ শুরু হলে খাদ্য, চিকিৎসা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
বিশ্বের জন্য এর অর্থ কী?
ইয়েমেনের নতুন সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়; এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এর প্রধান কারণ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য।
২০১৯ সালের আরামকো হামলার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোতে হামলা হলে বিশ্ব বাজারে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের হামলা হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় তেলের দাম দ্রুত অস্থির হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য পথ ব্যাহত হয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
পাশাপাশি, ইরান ও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নতুন করে পরিবর্তিত হতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নতুন সংঘাত ইয়েমেনের ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত মানবিক পরিস্থিতিকে আরও গভীর করে লাখ লাখ মানুষকে খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবার তীব্র হবে?
ইয়েমেন যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক দিক হলো সৌদি আরব ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
যদিও ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবুও ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া এবং ইরাকের মতো অঞ্চলে দুই দেশের স্বার্থের সংঘাত এখনো বিদ্যমান।
হুথিদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সৌদি সামরিক অভিযানের ফলে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও তীব্র হতে পারে।
বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে ইয়েমেন নতুন করে বড় আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
ইয়েমেন আবারও আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে?
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ইয়েমেনে স্থায়ী শান্তি আনতে পারেনি; এটি ছিল মূলত একটি অস্থায়ী বিরতি। হুথিদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা, সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ, বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিলিয়ে ইয়েমেন আবারও বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
তবে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ এখনো অনিবার্য নয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন জাতিসংঘের নেতৃত্বে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমাধান এবং হুথি ও অন্যান্য পক্ষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা।
গত এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ইয়েমেনে সামরিক বিজয় অর্জন করা সম্ভব হলেও শুধুমাত্র অস্ত্রের মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ ইয়েমেনের সংকট শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়; এটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক, মানবিক এবং ভূরাজনৈতিক সংকট।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন শুধু এটি নয় যে, হুথি-সৌদি সংঘাত নতুন আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আগে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।

