একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তবে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। সম্প্রতি রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ‘৬০ দিনের ছাড়’ বা অনুমতি পাওয়ার বিষয়টি দেশের সচেতন মহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে: বাংলাদেশ কার কাছ থেকে তেল কিনবে, তার জন্য ওয়াশিংটনের অনুমতি লাগবে কেন?
এই আপাতদৃষ্টিতে অবমাননাকর মনে হওয়া পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে অত্যন্ত জটিল কিছু ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ।
মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য (The Dollar Hegemony)
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল কেনাবেচার প্রধান মাধ্যম হলো মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ যখন রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশ থেকে তেল কিনতে যায়, তখন সেই পেমেন্ট বা অর্থ পরিশোধ করতে হয় ডলারে। এই ডলারের লেনদেন নিয়ন্ত্রিত হয় মার্কিন ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো দেশের ওপর (যেমন রাশিয়ার ওপর ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে) নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন তারা তাদের ব্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহার করে ওই নির্দিষ্ট দেশের সাথে ডলারের লেনদেন নিষিদ্ধ করে দেয়। বাংলাদেশ যদি অনুমতি ছাড়া রাশিয়ার সাথে লেনদেন করতে যায়, তবে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে পারে। ফলে পুরো দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ‘সুইফট’ (SWIFT) সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ মূলত পশ্চিমা বিশ্বের হাতে থাকায় বাংলাদেশ চাইলেই নিজের ইচ্ছামতো অর্থ পাঠাতে পারে না।
সেকেন্ডারি স্যাংশন বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার একটি শক্তিশালী অস্ত্র হলো ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’। এর অর্থ হলো—যুক্তরাষ্ট্র কেবল রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েই ক্ষান্ত থাকে না, বরং যে দেশ রাশিয়ার সাথে ব্যবসা করবে, তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার হুমকি দেয়।
বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ছাড়’ বা অনুমতি ছাড়া রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে, তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের মতো বড় রপ্তানি খাতগুলো মার্কিন বাজারে বাধার মুখে পড়তে পারে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ঠিক এই জায়গাটিতেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বা সম্প্রতি সম্পাদিত চুক্তিগুলো রয়েছে, সেগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বাংলাদেশকে রাশিয়ার মতো দেশ থেকে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
লজিস্টিকস, বিমা ও জাহাজ চলাচল
জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে কেবল তেল কিনলেই হয় না, তার জন্য বড় বড় জাহাজ (ট্যাঙ্কার) এবং সেই জাহাজের বিমা (Insurance) প্রয়োজন হয়। বিশ্বের অধিকাংশ বড় জাহাজ কোম্পানি এবং সামুদ্রিক বিমা সংস্থাগুলো পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপভিত্তিক।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এই কোম্পানিগুলো রাশিয়ার তেল বহন করতে রাজি হয় না। যদি বাংলাদেশ অনুমতি ছাড়া কোনো রুশ জাহাজ ভিড়াতে চায়, তবে সেই জাহাজ ভবিষ্যতে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক বন্দরে নিষিদ্ধ হতে পারে। সম্প্রতি ৬০ দিনের যে ছাড়ের কথা বলা হয়েছে, তাতে মূলত এই জাহাজগুলোর নিরাপত্তা, ডকিং এবং বিমার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই কারিগরি কারণেও আমেরিকার সবুজ সংকেত প্রয়োজন হয়।
|
জ্বালানি নিরাপত্তায় মার্কিন সংশ্লিষ্টতা
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়নে অনেক মার্কিন কোম্পানি (যেমন শেভরন) বিনিয়োগ করেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ একটি মার্কিন কোম্পানির মাধ্যমেই রুশ ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এই কৌশলটি অবলম্বন করা হয়েছে যাতে আন্তর্জাতিক আইনের কোনো লঙ্ঘন না হয়। (সিপিডি) সম্মেলনকেন্দ্রে গত (৩১ মার্চ) ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তির কারণে রাশিয়া থেকে কম দামের জ্বালানি আনতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি প্রয়োজন কি না, সেটি এখন সরকারের বিবেচ্য বিষয়।
ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য (The Geopolitical Balancing Act)
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ‘টাইট রোপ ওয়াক’ বা দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার মতো কূটনীতি অনুসরণ করছে। একদিকে রাশিয়ার কাছ থেকে কম দামে তেল আনা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত সরবরাহকারীরা এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয়। এই সংকটময় মুহূর্তে রাশিয়ার ১০ লাখ টন ডিজেল বাংলাদেশের জন্য লাইফলাইন হতে পারে। কিন্তু এই লাইফলাইন সচল রাখতে গিয়ে যদি পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
এটি কি সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন?
তাত্ত্বিকভাবে দেখলে এটি অবশ্যই একটি দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে বাধা। তবে বাস্তব অর্থনীতিতে একে বলা হয় ‘কৌশলগত আপস’। বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনতে চায়, কিন্তু সেই কেনাকাটার কারণে যেন দেশের ব্যাংকিং খাত বা তৈরি পোশাক রপ্তানি বিপদে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতেই এই ‘অনুমতি’ বা ‘ছাড়ের’ প্রয়োজন হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এই ৬০ দিনের ছাড় মূলত বাংলাদেশের কূটনৈতিক সফলতার একটি অংশ, যেখানে ওয়াশিংটন বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের গুরুত্ব অনুভব করে সাময়িকভাবে তাদের কঠোর অবস্থান শিথিল করেছে। তবে সতর্কবাণী অনুযায়ী, এই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ কীভাবে এই বাজার প্রতিযোগিতা এবং ভূ-রাজনৈতিক চাপ সামাল দেবে, সেটিই হবে সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।
আমাদের দেশ তেল কিনবে—এটি আমাদের অধিকার। কিন্তু সেই তেলের দাম শোধ করার বিশ্বজনীন ‘কারেন্সি’ এবং পরিবহনের ‘চাবি’ যেহেতু অন্যদের হাতে, তাই বৈশ্বিক রাজনীতির এই সমীকরণ মেনেই আপাতত অগ্রসর হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এমন পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, এই নির্ভরতার শৃঙ্খল ভাঙতে বাংলাদেশের কৌশল কী হওয়া উচিত?

