আরব বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তেল, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সমন্বয়ে। কয়েক দশকের মার্কিন সামরিক সহযোগিতা ও ডলারভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো আরব রাষ্ট্রগুলোকে নিরাপত্তা দিলেও তৈরি করেছে এক ধরনের নির্ভরতা।
তবে চীন, রাশিয়া ও বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার উত্থানে আরব দেশগুলো এখন কৌশলগত স্বাধীনতার নতুন পথ খুঁজছে। ফলে এই সম্পর্ক একই সঙ্গে স্বার্থের জোট ও অসম ক্ষমতার কাঠামোর এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।
সাম্রাজ্যের পতন থেকে পেট্রোডলার—কীভাবে গড়ে উঠল মার্কিন-আরব ক্ষমতার কাঠামো
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনীতি বুঝতে হলে শুধু গাজা যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, উপসাগরীয় সামরিক ঘাঁটি কিংবা তেল রাজনীতির দিকে তাকালে পুরো চিত্র স্পষ্ট হয় না। এর গভীরে রয়েছে প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাস—সাম্রাজ্যের পতন, ঔপনিবেশিক সীমান্ত নির্মাণ, জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা জোট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা।
আজকের আরব বিশ্ব একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম ধনী অঞ্চল এবং সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোর একটি। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েতের মতো দেশ বিপুল জ্বালানি সম্পদ, আধুনিক নগরায়ণ ও বৈশ্বিক বিনিয়োগের জন্য পরিচিত। আবার একই অঞ্চলে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতা, বিদেশি সামরিক উপস্থিতি এবং পরাশক্তির প্রতিযোগিতা। এই দ্বৈত বাস্তবতার পেছনে রয়েছে এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো, যার কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব বিশ্বের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।
এই সম্পর্ককে কেউ দেখেন কৌশলগত অংশীদারত্ব হিসেবে, যেখানে নিরাপত্তার বিনিময়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। আবার সমালোচকদের মতে, এটি এমন এক অসম নির্ভরতার কাঠামো, যেখানে আরব রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা, অস্ত্র, অর্থনীতি ও বৈদেশিক নীতি দীর্ঘদিন ধরে একটি পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাই প্রশ্নটি থেকেই যায়—এটি কি কেবল স্বার্থের জোট, নাকি আধুনিক যুগের এক ধরনের কাঠামোগত নির্ভরতা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে।

অটোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম
প্রায় চার শতাব্দী ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেছে অটোমান সাম্রাজ্য। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর অটোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হয়। যুদ্ধের শেষে সাম্রাজ্যের পতন শুধু একটি রাজবংশের অবসান ঘটায়নি; বরং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রও আমূল পরিবর্তন করে দেয়।
এর আগেই ১৯১৬ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাইক্স-পিকো চুক্তি অটোমান সাম্রাজ্যের আরব অঞ্চল ভাগাভাগির একটি পরিকল্পনা তৈরি করে। যদিও এটি সরাসরি আধুনিক সব সীমান্তের একমাত্র উৎস নয়, তবে পরবর্তী ম্যান্ডেট ব্যবস্থা ও ইউরোপীয় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লীগ অব নেশন্সের ম্যান্ডেট ব্যবস্থার অধীনে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইরাক, ফিলিস্তিন, ট্রান্সজর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এসব অঞ্চলের রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে ইউরোপীয় কৌশলগত স্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের হিসাবকে কেন্দ্র করে।
অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই সময়ের সীমান্ত ও রাষ্ট্র নির্মাণের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা সব সময় অগ্রাধিকার পায়নি। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়, সীমান্ত বিরোধ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বহু সংকট তৈরি হয়।
তবে এটিও সত্য যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সব সমস্যার একমাত্র কারণ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার নয়। স্থানীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং পরবর্তী আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়েই আজকের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ আধিপত্য থেকে মার্কিন প্রভাবের উত্থান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসে। ব্রিটেন ও ফ্রান্স অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দুই প্রধান পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসে।
এই সময় মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব কয়েকটি কারণে বহুগুণ বেড়ে যায়।
- প্রথমত, অঞ্চলটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর একটি।
- দ্বিতীয়ত, ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার সংযোগস্থল হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- তৃতীয়ত, ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই এই অঞ্চলকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের অংশ করতে চেয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উদ্বেগ ছিল তিনটি—বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখা, সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানো এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, সদ্য স্বাধীন হওয়া অনেক আরব রাজতন্ত্রের প্রধান উদ্বেগ ছিল নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। এই দুই স্বার্থের মিলন থেকেই গড়ে ওঠে মার্কিন-আরব সম্পর্কের নতুন অধ্যায়।
১৯৪৫ সালের ঐতিহাসিক বৈঠক: তেল ও নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ
১৯৪৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশা আবদুল আজিজ ইবনে সাউদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজ USS Quincy-তে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে অনেক বিশ্লেষক আধুনিক মার্কিন-সৌদি সম্পর্কের প্রতীকী সূচনা হিসেবে দেখেন।
যদিও ওই বৈঠকে “তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা” নামে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, পরবর্তী দশকগুলোতে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার মূল ধারণা ছিল—সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে, আর যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা সহযোগিতা ও রাজনৈতিক সমর্থন দেবে।
এই সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে শুধু সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; ধীরে ধীরে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সম্পর্ক গভীর হয়।
তেল: অর্থনীতির সম্পদ থেকে ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তেল শুধু একটি বাণিজ্যিক পণ্য ছিল না; এটি হয়ে ওঠে বৈশ্বিক ক্ষমতার অন্যতম উৎস।
সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিশাল তেল ও গ্যাস মজুদ আবিষ্কারের পর মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে, জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক নেতৃত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
অন্যদিকে আরব রাজতন্ত্রগুলোও উপলব্ধি করে যে, বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আধুনিক সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর ক্ষেত্রে তারা পশ্চিমা সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
এই পারস্পরিক প্রয়োজনই ধীরে ধীরে একটি নিরাপত্তা-অর্থনীতি সম্পর্ক তৈরি করে।
১৯৭৩ সালের তেল সংকট: বিশ্ব অর্থনীতিতে আরব শক্তির উত্থান
১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি বড় মোড় তৈরি করে।
মিসর ও সিরিয়ার নেতৃত্বাধীন আরব জোট এবং ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের পর আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি অংশ পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে তেল রপ্তানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় এবং পশ্চিমা অর্থনীতিগুলো বড় চাপের মুখে পড়ে।
এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও উপলব্ধি করে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামো প্রয়োজন।
পেট্রোডলার ব্যবস্থা: ডলার ও তেলের বন্ধন
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে এমন একটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী সময়ে “পেট্রোডলার ব্যবস্থা” নামে পরিচিত হয়।
এর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল—আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের প্রাধান্য এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল তেল আয় বৈশ্বিক ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
এই ব্যবস্থার ফলে:
- তেলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের চাহিদা বাড়ে;
- যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার বৈশ্বিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়;
- উপসাগরীয় দেশগুলো পশ্চিমা ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়;
- বিনিময়ে তারা নিরাপত্তা সহযোগিতা, অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পায়।
সমর্থকদের মতে, এটি ছিল দুই পক্ষের স্বার্থের সমন্বয়।
তবে সমালোচকদের মতে, এই কাঠামো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা তৈরি করে, যেখানে আরব রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত একটি বৃহৎ বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে।
প্রশ্নের শুরু এখানেই
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য বদলে গেছে। চীন ও ভারত বড় অর্থনৈতিক অংশীদার হয়েছে, রাশিয়া জ্বালানি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, ব্রিকস নতুন অর্থনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবু যুক্তরাষ্ট্র এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান নিরাপত্তা শক্তি। অস্ত্র, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সামরিক প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ওয়াশিংটনের প্রভাব গভীর।
ফলে আট দশকের এই সম্পর্ককে এক বাক্যে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
এটি যেমন আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধার উৎস, তেমনি এটি এমন একটি কাঠামোও তৈরি করেছে যেখানে বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রে সীমিত।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক মানচিত্র—নিরাপত্তার ছাতা, নাকি প্রভাবের অদৃশ্য কাঠামো?
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বোঝার জন্য শুধু কূটনৈতিক বিবৃতি বা রাজনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলেই হবে না। দেখতে হবে সেই সামরিক অবকাঠামোর দিকে, যা গত কয়েক দশকে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশপথ, সমুদ্রপথ, জ্বালানি স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এত গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে যে, অনেক বিশ্লেষকের মতে, আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণ ছাড়া কল্পনা করা কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এই উপস্থিতির মূল উদ্দেশ্য হলো—আন্তর্জাতিক জ্বালানি প্রবাহ রক্ষা, মিত্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব সীমিত রাখা। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই সামরিক নেটওয়ার্ক শুধু প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাখার সুযোগ দিয়েছে।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই প্রশ্ন তৈরি করে—মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কি আরব রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নাকি এমন একটি কাঠামো যা তাদের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করে?

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কৌশলের ভিত্তি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কোনো একক ঘটনার ফল নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে এই কাঠামো। তবে এর বড় সম্প্রসারণ ঘটে ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর।
১৯৯০ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠিত হয়। “অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম” অভিযানের মাধ্যমে ইরাকি বাহিনীকে কুয়েত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখে।
এই সময় থেকে সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর হয়। ইরাকের পতনের পর এবং বিশেষ করে ২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসনের পর এই সামরিক কাঠামো নতুন রূপ নেয়।
CENTCOM: মধ্যপ্রাচ্যের ওপর মার্কিন সামরিক কমান্ড
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমের মূল কেন্দ্র হলো United States Central Command বা CENTCOM / সেন্টকম।
এই কমান্ডের দায়িত্বের আওতায় রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়ার কিছু অংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সেন্টকম শুধু যুদ্ধ পরিচালনা করে না; বরং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমন্বয়ের কাজও করে।
ইরাক যুদ্ধ, আইএসবিরোধী অভিযান, সিরিয়া সংকট, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার সময় সেন্টকম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২০২৬ সালে এসে এই কমান্ডের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, গাজা যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাব এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কিন্তু, ইরান যুদ্ধ থেকে শুরু করে গাজার বোর্ড অব পিসের কার্যক্রম ঘিরে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
কাতার: মার্কিন সামরিক শক্তির আঞ্চলিক কেন্দ্র
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর একটি হলো কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি।
দোহা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিমানঘাঁটিগুলোর একটি। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও লজিস্টিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইরাক অভিযান এবং আইএসবিরোধী অভিযানে আল উদেইদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
কাতারের জন্য এই ঘাঁটি একটি বিশেষ কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করেছে।
একদিকে:
- এটি দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করেছে;
- আঞ্চলিক হুমকির বিরুদ্ধে একটি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিয়েছে।
অন্যদিকে:
- দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো ব্যাপকভাবে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
তবে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দোহার প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
তবুও, কাতার একই সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার হয়েও দেশটি ইরান, তুরস্ক এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। গাজা ইস্যুতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করেছে।
এই দ্বৈত অবস্থান দেখায়, আরব রাষ্ট্রগুলো এখন শুধু একটি শক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
বাহরাইন: পঞ্চম নৌবহর এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা
ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইনের গুরুত্ব তার আয়তনে নয়, অবস্থানে।
এখানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর। এই নৌবহরের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে পারস্য উপসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগরের কিছু অংশে মার্কিন নৌ কার্যক্রম পরিচালনা।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার সঙ্গে এই নৌবহরের ভূমিকা সরাসরি যুক্ত।
প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ এই সংকীর্ণ জলপথ ব্যবহার করে। ফলে এখানে কোনো সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়ে।
ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার সময় বাহরাইনে মার্কিন নৌ উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তবে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে এই ঘাঁটিগুলোতেও হামলা চালিয়েছে তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এই প্রনালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যহত হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব বাহরাইনসহ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে লিখছে। সেক্ষেত্রেও বাহরাইনে অবস্থান অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে।
কুয়েত: যুদ্ধের স্মৃতি থেকে নিরাপত্তা নির্ভরতা
কুয়েতের নিরাপত্তা বাস্তবতা গড়ে উঠেছে ১৯৯০ সালের ইরাকি আগ্রাসনের অভিজ্ঞতা থেকে।
সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী যখন কুয়েত দখল করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটিকে মুক্ত করে।
এই ঘটনার পর কুয়েতের নিরাপত্তা নীতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ায় এবং মার্কিন বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
বর্তমানে কুয়েত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক পরিবহন, রসদ সরবরাহ এবং আঞ্চলিক অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কুয়েতের উদাহরণ দেখায়, অনেক আরব রাষ্ট্রের কাছে মার্কিন সামরিক সহযোগিতা শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়; বরং অতীতের নিরাপত্তা সংকট থেকে তৈরি হওয়া একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
সৌদি আরব: অস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক
মার্কিন-সৌদি সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী।
যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার প্রযুক্তি, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং গোয়েন্দা সহযোগিতায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। হামলার পর সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং বহিরাগত প্রযুক্তি নির্ভরতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এছাড়াও, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যখন ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে উত্তপ্ত পরিস্থিতি, ঠিক তখনই সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল ও স্পর্শকাতর করে তুলছে।
এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, বিপুল সামরিক ব্যয় করেও আধুনিক যুদ্ধের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো পশ্চিমা সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হলেও ইরানের সাথে নতুন কোনো যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাত এড়াতে নিজেদের কঠোরভাবে নিরপেক্ষ রাখার কৌশল অবলম্বন করছে। কিন্তু, অনেকের দাবি ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় সৌদি আরবের মদদ রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র, কৌশলে বহুমুখী সম্পর্ক
সংযুক্ত আরব আমিরাত গত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং সামরিক প্রশিক্ষণে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে।
একই সঙ্গে আবুধাবি চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে।
এই নীতি দেখায়, আরব বিশ্বের কিছু দেশ এখন “একক মিত্র” মডেলের পরিবর্তে “বহুমুখী অংশীদারত্ব” তৈরি করতে চাইছে।
তবে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন: ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে একে অপরের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার খবর মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে এক চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এছাড়াও, এমন উত্তেজনার মাঝে গোপনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সফরের তথ্যও প্রকাশে আসে। যা ওয়াশিংটনের সাথে আমিরাতে সম্পর্কের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়।
জর্ডান ও ওমান: ভারসাম্যের কৌশল
জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার।
ইসরায়েল, সিরিয়া, ইরাক ও সৌদি আরবের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সামরিক প্রশিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা রয়েছে।
অন্যদিকে ওমান অনুসরণ করেছে তুলনামূলক স্বাধীন কূটনীতি।
হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থান করলেও ওমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ ধরে রেখেছে।
২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গোপন আলোচনায় ওমান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল।
সামরিক নিরাপত্তা নাকি কৌশলগত নির্ভরতা?
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো—এই উপস্থিতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছে।
সমর্থকদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, সন্ত্রাসী সংগঠনের উত্থান এবং আঞ্চলিক সংঘাতের বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা অংশীদার প্রয়োজন।
কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন হলো—যখন একটি অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অস্ত্র প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং সামরিক পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে একটি বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বাধীনতা কতটা থাকে?
এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন ইরান, গাজা যুদ্ধ এবং ইসরায়েল ইস্যুতে আরব রাষ্ট্রগুলোকে একই সঙ্গে নিজেদের জনগণের মনোভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।
তবে, ইরান সংঘাত, গাজা পুনর্গঠন, লেবানন সংকট ও ইসরায়েলের বেপরোয়া হামলা ওয়াশিংটনের মুখোশ উন্মোচন করে।
ইরান, ইসরায়েল ও গাজা—যে সমীকরণে আটকে আছে আরব বিশ্বের কূটনীতি
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনীতি বুঝতে হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি বা তেল অর্থনীতি বিশ্লেষণ করলেই যথেষ্ট নয়। এই অঞ্চলের সবচেয়ে জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে তিনটি বিষয়কে ঘিরে—ইরানের উত্থান, ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশল এবং ফিলিস্তিন প্রশ্ন। এই তিনটি ইস্যুতে আরব বিশ্বের অবস্থান একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে তেমনি দেখায় কেন অনেক আরব রাষ্ট্র নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল থেকেও প্রকাশ্যে স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল—আরব বিশ্বের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েল। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর আঞ্চলিক ক্ষমতার সমীকরণ বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়ে। তেহরানের নতুন ইসলামিক সরকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পশ্চিমাপন্থী রাজতন্ত্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। এর পর থেকেই উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলোর কাছে ইরান একটি প্রধান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
এই পরিবর্তনই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেয়। ওয়াশিংটনের কাছে তখন তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উপসাগরীয় মিত্রদের স্থিতিশীল রাখা। অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র মনে করতে থাকে, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা অপরিহার্য।

ইরানের উত্থান: কেন উপসাগরীয় দেশগুলো উদ্বিগ্ন?
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান শুধু একটি রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়নি; বরং তার পররাষ্ট্রনীতির চরিত্রও বদলে যায়।
তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে দেখে এসেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানকে নিজের আঞ্চলিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।
ইরানের শক্তি বৃদ্ধির প্রধান কয়েকটি ক্ষেত্র হলো—
- ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি;
- ড্রোন প্রযুক্তি;
- পারমাণবিক সক্ষমতা উন্নয়নের প্রচেষ্টা;
- আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক;
- পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক প্রভাব বিস্তার।
লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী, সিরিয়ার কিছু ইরানের প্রতি পূর্ণসমর্থন এবং ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে আরব রাজতন্ত্রগুলোর উদ্বেগের কারণ।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দৃষ্টিতে এটি শুধু ধর্মীয় বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং আঞ্চলিক প্রভাবের লড়াই।
সুন্নি-শিয়া বিভাজনের বাইরে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা
ইরান ও আরব বিশ্বের সম্পর্ককে অনেক সময় শুধু সুন্নি-শিয়া সংঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
সৌদি আরব নিজেকে আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে ইরান নিজেকে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
উভয় দেশই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো, জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রগুলো হলো—
- ইয়েমেন;
- ইরাক;
- সিরিয়া;
- লেবানন;
- পারস্য উপসাগর।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা সৌদি ও অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রের কাছে শুধু বাইরের হুমকি মোকাবিলার বিষয় নয়; বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষার একটি উপায়।
সৌদি-ইরান সম্পর্ক: শত্রুতা থেকে নিয়ন্ত্রিত কূটনীতির পথে
দীর্ঘদিন সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক ছিল তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ।
২০১৬ সালে সৌদি আরবে এক শিয়া ধর্মীয় নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। এরপর ইয়েমেন যুদ্ধ, সিরিয়া সংকট এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তোলে।
কিন্তু ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ঘোষণা দেয়।
এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
কারণ এতে দেখা যায়, সৌদি আরব একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব বজায় রাখছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও বাড়াচ্ছে।
এটি আরব বিশ্বের নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা—নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে বহুমুখী সম্পর্ক।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত: ছায়াযুদ্ধ থেকে সরাসরি হামলার ঝুঁকি
দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত ছিল মূলত পরোক্ষ।
সাইবার হামলা, গোপন অভিযান, মিত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংঘর্ষ এবং সীমিত সামরিক পদক্ষেপ—এসবের মধ্যেই সংঘাত সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে।
বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের পর ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা, লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘর্ষ এবং সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যে ফেলে।
২০২৬ সালে এসে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে পুরো আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে।
কারণ সংঘাতে প্রথম ঝুঁকিতে পড়েছে—
- সৌদি আরবের তেল স্থাপনা;
- সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র;
- কাতার ও বাহরাইনের সামরিক স্থাপনা;
- হরমুজ প্রণালির জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা।
ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি তীব্র হয়ে ওঠা সংঘাতের মধ্য দিয়ে ভূ-রাজনীতির একটি পরিবর্তনশীল চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। এই কারণেই অনেক আরব রাষ্ট্র প্রকাশ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানালেও গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় তারা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গাজা যুদ্ধ: আরব সরকার বনাম আরব জনমতের দ্বন্দ্ব
ফিলিস্তিন প্রশ্ন আরব বিশ্বের রাজনীতিতে সবচেয়ে আবেগপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। গাজা যুদ্ধ এই ইস্যুকে আবারও মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
আরব জনগণের বড় অংশ গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, মানবিক সংকট এবং ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
বিভিন্ন আরব দেশে বিক্ষোভ, সংহতি কর্মসূচি এবং সামাজিক মাধ্যমে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন দেখা গেছে।
কিন্তু সরকারগুলোর অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মিসর, জর্ডানসহ অধিকাংশ আরব দেশ—
- যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে;
- মানবিক সহায়তার দাবি তুলেছে;
- ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে।
তবে একই সময়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
এখানেই আরব রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক সংকট স্পষ্ট হয়।
একদিকে জনগণের আবেগ ও ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন সমর্থন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক: নতুন বাস্তবতার সূচনা
দীর্ঘদিন ইসরায়েলকে আরব বিশ্বের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হলেও সাম্প্রতিক দশকে সেই সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে।
২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পরে মরক্কোও একই পথে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়ার প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিল।
সমর্থকদের মতে, এই সম্পর্ক আঞ্চলিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করেছে।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী সমাধান ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ আরব ঐতিহাসিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
গাজা যুদ্ধের পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
সৌদি আরবও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছিল। তবে গাজা যুদ্ধের পর সেই প্রক্রিয়া বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত কৌশল: একই সঙ্গে ইসরায়েল ও আরব মিত্র
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কৌশলগত বৈশিষ্ট্য হলো—একই সময়ে একাধিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।
ওয়াশিংটন একদিকে ইসরায়েলকে শক্তিশালী সামরিক সহায়তা দেয়।
অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান ও মিসরের মতো আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখে।
এই নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র—
- ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়;
- ইরানের প্রভাব সীমিত রাখতে চায়;
- উপসাগরীয় জ্বালানি প্রবাহ রক্ষা করতে চায়;
- মধ্যপ্রাচ্যে নিজের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে চায়।
কিন্তু এই কৌশলের সমালোচকরা বলেন, এর ফলে আরব রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় এমন অবস্থায় পড়ে যেখানে তাদের নিজস্ব জনগণের প্রত্যাশা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য করতে হয়।
তাহলে এটি জোট, নাকি নির্ভরতা?
ইরান, গাজা এবং ইসরায়েল ইস্যুতে আরব বিশ্বের অবস্থান একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে।
আরব রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে কারণ তারা মনে করে, বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের সামরিক সক্ষমতার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।
কিন্তু একই সময়ে তারা চীন, রাশিয়া, ভারত এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা এক ধরনের দ্বৈত নির্ভরতা তৈরি করেছে। তবে, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক মিত্ররা অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ওয়াশিংটনের কৌশলগত ইশারা বা পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র, অর্থনীতিতে বহুমুখী বিশ্ব।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—যে অঞ্চলের নিরাপত্তা, অস্ত্র, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তের বড় অংশ এখনো একটি বহিরাগত শক্তির সঙ্গে যুক্ত, সেই অঞ্চলের প্রকৃত স্বাধীনতার পরিসর কতটা?
পেট্রোডলারের ভবিষ্যৎ, চীনের উত্থান এবং আরব বিশ্বের স্বাধীনতার নতুন পরীক্ষা
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব শুধু সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্র চুক্তি কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এর গভীর ভিত্তি রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেও। তেল, ডলার, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি বাজার—এই ৪টি উপাদান গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব বিশ্বের সম্পর্ককে একটি বিশেষ কাঠামোর মধ্যে ধরে রেখেছে।
এই কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু হলো পেট্রোডলার ব্যবস্থা। অনেক বিশ্লেষকের মতে, পেট্রোডলার শুধু একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নয়; এটি ছিল এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থায় নিজের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো পেয়েছে নিরাপত্তা, অস্ত্র, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন।
কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্ব আগের মতো নেই। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার জ্বালানি কূটনীতি, ব্রিকসের সম্প্রসারণ, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের আলোচনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার—সব মিলিয়ে কয়েক দশকের পুরোনো এই ব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, আরব বিশ্ব কি ধীরে ধীরে মার্কিন নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসছে, নাকি শুধু অংশীদার পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন এক ভারসাম্যের দিকে এগোচ্ছে?

পেট্রোডলার: যে ব্যবস্থায় তেল ও ডলার একসঙ্গে শক্তি হয়ে ওঠে
১৯৭০-এর দশকের শুরুতে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় সংকটের মুখে পড়ে।
১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডলারকে স্বর্ণের সঙ্গে সরাসরি বিনিময়ের ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে। এর ফলে ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এরপর ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং তেল সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়। আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে তেল রপ্তানি সীমিত করলে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
এই সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।
মূল কাঠামো ছিল—
- আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার;
- তেল বিক্রির আয় পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ;
- বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা।
এর ফলে ডলারের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
কারণ বিশ্বের যেসব দেশ তেল কিনত, তাদের ডলার প্রয়োজন হতো। আর তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর বিপুল আয় আবার ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় ফিরে আসত।
এই চক্র যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিশেষ সুবিধা দেয়।
আরব রাষ্ট্রগুলো কেন ডলার ব্যবস্থার বাইরে যেতে পারছে না?
পেট্রোডলার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সঙ্গে যুক্ত বিশাল বৈশ্বিক অবকাঠামো।
আরব রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি শুধু তেল বিক্রির ওপর নির্ভর করে না; বরং যুক্ত রয়েছে—
- আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা;
- বৈদেশিক বিনিয়োগ;
- সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়;
- প্রযুক্তি আমদানি;
- বৈশ্বিক বাণিজ্য।
এই সব ক্ষেত্রেই ডলার এখনো প্রধান ভূমিকা পালন করে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতের মতো দেশগুলো বিপুল সার্বভৌম সম্পদ তহবিল পরিচালনা করে। এসব তহবিলের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
ফলে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসা তাদের জন্য শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকিও।
চীনের উত্থান: আরব বিশ্বের নতুন অর্থনৈতিক অংশীদার
গত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো চীনের উত্থান।
আজ চীন উপসাগরীয় দেশগুলোর অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার।
বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য চীন গুরুত্বপূর্ণ কারণ—
- চীন সৌদির অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা;
- অবকাঠামো বিনিয়োগে সক্রিয়;
- প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও চীনের সঙ্গে বন্দর, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বাণিজ্য খাতে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করেছে।
চীনের এই উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
কারণ দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছিল প্রধান বহিরাগত শক্তি। এখন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেইজিং দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠছে।
কিন্তু চীন কি যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নিরাপত্তা শক্তি?
এখানেই সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
চীন মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত এগিয়ে গেলেও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে—
- উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি;
- বিমানবাহী রণতরি;
- উন্নত গোয়েন্দা ব্যবস্থা;
- ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি;
- দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারিত্ব।
অন্যদিকে চীন এখনো মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের দিকে বেশি মনোযোগী।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ছিল একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। এটি দেখিয়েছে, বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন ভূমিকা নিতে সক্ষম।
তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে আরব রাষ্ট্রগুলো এখনো ওয়াশিংটনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
রাশিয়া ও ওপেক প্লাস: তেলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো রাশিয়ার সঙ্গে আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক বৃদ্ধি।
বিশেষ করে সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যে ওপেক প্লাস কাঠামোর সহযোগিতা বিশ্ব তেল বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তেল উৎপাদন কমানো বা বাড়ানোর সিদ্ধান্তে এখন শুধু পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব নেই; বরং রিয়াদ ও মস্কোর সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের চাপও রয়েছে।
আরব রাষ্ট্রগুলো এই ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করছে।
তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখছে, আবার রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতাও চালিয়ে যাচ্ছে।
ব্রিকস ও ডলারবহির্ভূত বাণিজ্যের আলোচনা
ব্রিকসের সম্প্রসারণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসরসহ কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্র ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
এই প্ল্যাটফর্মে আলোচনা হচ্ছে—
- স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য;
- বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা;
- উন্নয়ন সহযোগিতা;
- ডলার নির্ভরতা কমানো।
তবে বাস্তবতা হলো, ডলারের বিকল্প হিসেবে এখনো কোনো একক ব্যবস্থা তৈরি হয়নি।
বিশ্বের বড় অংশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আর্থিক লেনদেন এখনো ডলারনির্ভর।
তাই ব্রিকসের উত্থান একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা হলেও তা এখনো পেট্রোডলার ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক বিকল্প নয়।
সৌদি ভিশন ২০৩০: নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে সৌদি আরবে।
“ভিশন ২০৩০” পরিকল্পনার মাধ্যমে রিয়াদ তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
লক্ষ্য হলো—
- পর্যটন বৃদ্ধি;
- প্রযুক্তি খাত উন্নয়ন;
- বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ;
- শিল্পায়ন;
- নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও একইভাবে দুবাই ও আবুধাবিকে বৈশ্বিক ব্যবসা ও প্রযুক্তি কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
কাতার গ্যাস, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিজের প্রভাব বাড়িয়েছে।
এই পরিবর্তনগুলো দেখায়, আরব রাষ্ট্রগুলো শুধু নিরাপত্তায় নয়, অর্থনীতিতেও নিজেদের বিকল্প সক্ষমতা তৈরি করতে চাইছে।
কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে পুরোনো বাস্তবতা রয়ে গেছে
অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ যতই এগোক, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব, গাজা যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাব এবং ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা—এসব সংকটে আরব রাষ্ট্রগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
২০২৬ সালেও বাস্তবতা হলো—
- সৌদি আরব উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য পশ্চিমা সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল;
- কাতারের নিরাপত্তা কাঠামোতে মার্কিন ঘাঁটির গুরুত্ব রয়েছে;
- বাহরাইনে মার্কিন নৌ উপস্থিতি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ;
- সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
অর্থাৎ অর্থনীতিতে বহুমুখীকরণ হলেও নিরাপত্তায় পরিবর্তন ধীর।
আধুনিক দাসত্ব, নাকি বাস্তববাদী কূটনীতি?
এখানেই মূল বিতর্ক।
সমালোচকদের মতে, আরব বিশ্বের বড় অংশ এমন একটি কাঠামোর মধ্যে রয়েছে যেখানে—
- নিরাপত্তা বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীল;
- অস্ত্র সরবরাহ নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের হাতে;
- বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ডলারকেন্দ্রিক;
- গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সিদ্ধান্তে বড় শক্তির প্রভাব রয়েছে।
তাদের মতে, এটি সরাসরি উপনিবেশ নয়, কিন্তু এক ধরনের কাঠামোগত নির্ভরতা।
অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি হলো, আরব রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তারা কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার অংশ নয়; বরং নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে অংশীদারত্ব বেছে নিয়েছে।
বাস্তবতা সম্ভবত দুইয়ের মাঝামাঝি।
এটি একই সঙ্গে স্বার্থের জোট এবং অসম ক্ষমতার সম্পর্ক।
ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্য: একক শক্তির যুগ শেষ?
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত সামরিক শক্তি।
কিন্তু চীন অর্থনীতিতে, রাশিয়া জ্বালানি রাজনীতিতে এবং অন্যান্য শক্তি কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
আরব রাষ্ট্রগুলোও এখন এক নতুন নীতি গ্রহণ করছে—
“একজন নিরাপত্তা অংশীদার, বহু অর্থনৈতিক অংশীদার।”
তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে না, আবার পুরোপুরি ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করতেও চাইছে না।
শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্নটি থেকেই যায়— মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রগুলো কি ধীরে ধীরে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা পুনর্গঠন করতে পারবে, নাকি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির বাস্তবতা তাদের আবারও মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার মধ্যেই আটকে রাখবে?
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আরব বিশ্বের পথ—মার্কিন ছায়া থেকে কৌশলগত স্বাধীনতার সন্ধান
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গত আট দশকের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—আরব বিশ্বের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতি এমন একটি কাঠামোর মধ্যে গড়ে উঠেছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তেল, ডলার, সামরিক প্রযুক্তি, অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে।
কিন্তু ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য আর আগের মধ্যপ্রাচ্য নয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত সামরিক শক্তি। অন্যদিকে চীন অর্থনৈতিকভাবে, রাশিয়া জ্বালানি রাজনীতিতে এবং ব্রিকস-ঘনিষ্ঠ দেশগুলো বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামোর আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
ফলে আরব বিশ্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কি যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যেই থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে একটি স্বাধীন, বহুমুখী কৌশলগত অবস্থান তৈরি করবে?

মার্কিন-আরব সম্পর্কের ভবিষ্যৎ: বিচ্ছেদ নয়, পুনর্বিন্যাস
গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও আরব বিশ্বের সম্পর্ককে সহজভাবে “মিত্রতা” বা “নির্ভরতা”—কোনো এক শব্দে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
এই সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন—
- মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা;
- বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা;
- ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
- আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব সীমিত রাখা।
অন্যদিকে আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রয়োজন—
- উন্নত সামরিক প্রযুক্তি;
- আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা;
- গোয়েন্দা সহযোগিতা;
- বৈশ্বিক কূটনৈতিক সমর্থন;
- বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব।
এই পারস্পরিক প্রয়োজনের কারণে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে এর চরিত্র পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
আগের মতো একক নির্ভরতার পরিবর্তে আরব রাষ্ট্রগুলো এখন “কৌশলগত ভারসাম্য” নীতির দিকে এগোচ্ছে।
সৌদি আরব: ওয়াশিংটনের মিত্র, কিন্তু একক নির্ভরতার বাইরে
সৌদি আরব এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
দীর্ঘদিন দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সৌদি আরব এখন নিজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে।
ভিশন ২০৩০ শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়; এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠনও।
রিয়াদ এখন—
- চীনের সঙ্গে তেল ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়াচ্ছে;
- রাশিয়ার সঙ্গে ওপেক প্লাস সহযোগিতা বজায় রাখছে;
- ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও অবকাঠামো সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে;
- প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে নতুন অংশীদার খুঁজছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে পরিত্যাগ করছে। বরং বাস্তবতা হলো, রিয়াদ এখন একই সঙ্গে দুই ধরনের সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়—
- নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র,
- অর্থনীতি ও কূটনীতিতে বহুমুখী বিশ্ব।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: ছোট রাষ্ট্র, বড় কৌশল
সংযুক্ত আরব আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সক্রিয় ভারসাম্য রক্ষাকারী রাষ্ট্রগুলোর একটি।
দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তি, বন্দর, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
আবুধাবির কৌশল হলো—কোনো একক শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়ানো।
এই নীতির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত একই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব, এশিয়া এবং রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে এখানেও নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
কাতার: নিরাপত্তা ও মধ্যস্থতার অনন্য মডেল
কাতারের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল কূটনৈতিক সমীকরণগুলোর একটি।
একদিকে দেশটিতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি।
অন্যদিকে কাতার ইরান, তুরস্ক এবং ফিলিস্তিনি পক্ষগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
গাজা যুদ্ধের সময় কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা দেশটির কূটনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
কাতারের কৌশল দেখায়, ছোট রাষ্ট্রগুলোও যদি অর্থনৈতিক শক্তি, জ্বালানি সম্পদ এবং কূটনৈতিক দক্ষতা ব্যবহার করতে পারে, তাহলে তারা বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
ইরান: পরিবর্তিত আঞ্চলিক সমীকরণের কেন্দ্র
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের সম্পর্কের ওপর।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাবের প্রধান চ্যালেঞ্জার।
তেহরানের রয়েছে—
- বড় সামরিক সক্ষমতা;
- ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি;
- আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্ক;
- গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের প্রভাব সীমিত রাখতে চায়। এই দ্বন্দ্বের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোও একটি কঠিন অবস্থানে রয়েছে।
তারা ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ চায় না, আবার ইরানের সামরিক প্রভাব বৃদ্ধিকেও উদ্বেগের চোখে দেখে। ফলে ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে—যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন কোনো সমঝোতা তৈরি হয় কি না।
গাজা ও ফিলিস্তিন: আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা
ফিলিস্তিন প্রশ্ন আগামী দিনেও আরব বিশ্বের রাজনীতির কেন্দ্রেই থাকবে।
গাজা যুদ্ধ দেখিয়েছে, আরব সরকারগুলোর কূটনৈতিক বাস্তবতা এবং জনগণের আবেগের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
সরকারগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেয়।
কিন্তু জনগণের বড় অংশ ফিলিস্তিন ইস্যুকে পরিচয়, ন্যায়বিচার এবং মানবিকতার প্রশ্ন হিসেবে দেখে।
এই ব্যবধান আরব সরকারগুলোর জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ করে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, তাদের জন্য বিষয়টি আরও জটিল।
কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে আরব জনগণের বড় অংশ ফিলিস্তিনের অধিকারের প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থান প্রত্যাশা করে।
মার্কিন সামরিক ছাতা কত দিন থাকবে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আরব বিশ্ব কি নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারবে?
বর্তমানে বাস্তবতা হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোর অধিকাংশের কাছে এককভাবে বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা সীমিত।
তারা উন্নত অস্ত্র কিনেছে, কিন্তু এসব ব্যবস্থার পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তায় পশ্চিমা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমলেও বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
“আধুনিক দাসত্ব” বিতর্কের শেষ প্রশ্ন
আরব বিশ্বের মার্কিন নির্ভরতা নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখানেই।
এক পক্ষের যুক্তি—
এটি আধুনিক দাসত্ব নয়। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। নিরাপত্তা, অস্ত্র ও প্রযুক্তির বিনিময়ে তারা একটি বাস্তববাদী অংশীদারিত্ব বেছে নিয়েছে।
অন্য পক্ষের যুক্তি—
যখন একটি অঞ্চলের নিরাপত্তা, সামরিক প্রযুক্তি, আর্থিক কাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত একটি পরাশক্তির সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেটি অসম ক্ষমতার সম্পর্ক তৈরি করে।
এই নির্ভরতা সরাসরি রাজনৈতিক দখল নয়, কিন্তু একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। বাস্তবতা সম্ভবত মাঝামাঝি জায়গায়।
আরব রাষ্ট্রগুলো স্বাধীন, কিন্তু পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা এখনো সীমিত। তারা যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার, কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্য: নতুন ভারসাম্যের সন্ধানে
আগামী দশকের মধ্যপ্রাচ্য হবে প্রতিযোগিতামূলক বহুমেরু অঞ্চলের উদাহরণ।
- যুক্তরাষ্ট্র থাকবে।
- চীন আরও সক্রিয় হবে।
- রাশিয়া জ্বালানি রাজনীতিতে ভূমিকা রাখবে।
- ভারত অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে গুরুত্ব বাড়াবে।
- আরব রাষ্ট্রগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানোর চেষ্টা করবে।
- কিন্তু শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে সামলানো— নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা।
আট দশকের মার্কিন-আরব সম্পর্ক দেখিয়েছে, শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে জোট যেমন নিরাপত্তা দিতে পারে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতাও তৈরি করতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের প্রশ্ন শুধু এটি নয় যে আরব বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকবে কি না।
বরং বড় প্রশ্ন হলো—আরব বিশ্ব কি এমন এক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে, যেখানে নিরাপত্তার জন্য অংশীদার থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্তের জন্য থাকবে নিজস্ব স্বাধীনতা?
মধ্যপ্রাচ্যের আগামী ইতিহাস সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তরই লিখবে।
তথ্যসূত্র: British National Archives; Yale Avalon Project; U.S. Department of State Office of the Historian; Franklin D. Roosevelt Presidential Library; U.S. Central Command (CENTCOM); U.S. Department of Defense; Congressional Research Service (CRS); International Energy Agency (IEA); U.S. Energy Information Administration (EIA); SIPRI; IISS Military Balance; IMF; World Bank; OPEC; IAEA; UN OCHA; Council on Foreign Relations; Carnegie Endowment; RAND Corporation; International Crisis Group; Reuters; Associated Press; BBC; Al Jazeera; BRICS and related government documents.

