গত সপ্তাহে ইসরায়েল সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটির রানওয়েতে হামলা চালায়। এটি মূলত একটি নিষ্ক্রিয় ঘাঁটি, যেখানে কোনো বিমান চলাচল করে না। সামান্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো ছাড়া এই হামলা কোনো উল্লেখযোগ্য সামরিক উদ্দেশ্য সাধন করতে পারেনি বলেই মনে হচ্ছে।
তবে, এই নির্দিষ্ট সময়ে ও স্থানে ইসরায়েলি হামলার তাৎপর্য একাধিক পরস্পর সংযুক্ত কারণ থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
ঘাঁটিটি তুরস্ক সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে ইদলিবে অবস্থিত এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই হামলাকে তুরস্কের প্রতি একটি বার্তা হিসেবেই স্পষ্টভাবে আখ্যা দিয়েছেন। আঙ্কারা সহজেই ধরে নিতে পারত যে ইসরায়েলি বিমানগুলো তাদের ভূখণ্ডকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং সেই কারণে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে হামলাটিকে ন্যায্য প্রমাণ করতে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তি দিয়েছেন: “আমরা দক্ষিণে অগ্রসরমান কোনো তুর্কি সামরিক ঘাঁটি বরদাস্ত করব না, কারণ এটি আমাদের জন্য হুমকি। আমরা এই বার্তা দিয়েছি: এমনটা করবেন না। কিন্তু স্পষ্টতই তারা তা শোনেনি, তাই আমরা নিশ্চিত করেছি যে তারা যেন বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝে।”
একইভাবে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দাবি করেছেন : “এরদোয়ান তুরস্ককে সিরিয়ায় বিপজ্জনক অভিযানে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। ইসরায়েল কোনো পক্ষকেই তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে দেবে না।”
কিন্তু ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতম মিত্রদের কেউ কেউও এই বয়ান মানতে নারাজ ছিল এবং তারা এই হামলাকে একটি অপ্রয়োজনীয়, বেপরোয়া ও বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি বলে নিন্দা করেছে।
তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়ায় বিশেষ দূত টম ব্যারাক আবু আল-দুহুর বিমান ঘাঁটিতে হামলাকে একটি “অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কোনো ভূমিকা রাখে না” বলে বর্ণনা করেছেন ।
এমনকি ইসরায়েলপন্থী অন্যতম কট্টর মার্কিন কর্মকর্তা রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইসরায়েলি হামলাটি উত্তেজনা ও সহিংসতা বাড়িয়ে তুলছে। তিনি বলেন, তিনি তার সহকর্মীদের সঙ্গে একটি সংঘাত নিরসন ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন এবং যোগ করেন: “কেউই উত্তেজনা বা সহিংসতার বৃদ্ধি দেখতে চায় না। তাই, যেকোনো ধরনের কার্যকলাপ প্রশমিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।”
ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় এক বছরব্যাপী আলোচনার পর সিরিয়া ও ইসরায়েল যখন একটি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে , তখন বিমানঘাঁটিতে বোমা হামলার ইসরায়েলি সিদ্ধান্তটি শুধু তুরস্কের জন্যই একটি বার্তা ছিল না; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছেও একটি স্পষ্ট সংকেত পাঠিয়েছে। প্রশ্ন হলো: কেন?
কৌশলগত গণনা
তিনটি প্রধান কারণ এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে পারে – দুটি কৌশলগত এবং একটি রণনৈতিক।
কৌশলগতভাবে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অক্টোবরের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং মনগড়া ‘আসন্ন তুর্কি হুমকি’ একটি রাজনৈতিকভাবে কার্যকর তাস হিসেবে কাজ করতে পারে।
তিনি বেশ কিছুদিন ধরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রে তুরস্ক-বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে আসছেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সেই প্রচারণায় সামরিক পদক্ষেপ যুক্ত করা হলে তুরস্কের কথিত হুমকিটি আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠবে এবং এটি ইসরায়েলিদের সংগঠিত করতে ও তার নির্বাচনী ভিত্তি সুসংহত করতে সাহায্য করতে পারে।
এখানের মূল সমস্যা হলো, তুরস্ক একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ সিরিয়া চায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি ইসরায়েলের কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের সম্পূর্ণ বিপরীত: এমন একটি সিরিয়া যা দুর্বল, বিভক্ত , অস্থিতিশীল এবং পরনির্ভরশীল থাকবে।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের ভাষায়: “তুর্কিরা সিরিয়ায় একজন শক্তিশালী [প্রেসিডেন্ট] আহমদ আল-শারাকে দেখতে চায়। ইসরায়েল সিরিয়ায় একজন দুর্বল আহমদ আল-শারাকে দেখতে চায়… সিরিয়ায় আহমদ আল-শারাকে শক্তিশালী করার জন্য যেকোনো সাহায্যকে ইসরায়েল তার স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে দেখবে।”
কৌশলগতভাবে এরদোয়ান ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি পদক্ষেপে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ছাড়িয়ে গেছেন।
এই কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মাত্রা ইসরায়েলের জন্য অস্বাভাবিক, কারণ দেশটির কর্মকর্তারা ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল, প্রতিক্রিয়াশীল, আদর্শগতভাবে দুর্বল অথবা কম সক্ষম প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করে এসেছেন। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে একজন “চতুর ও বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন , যিনি ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলতে চান।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা শারাকে দ্রুত সংঘাতে উস্কে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। তারা আরও চেয়েছিল কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্রসজ্জিত করে ইরানে বিশৃঙ্খলা ছড়াতে, আঙ্কারাকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ থেকে বিরত রাখতে, একটি “ ষটভুজ জোট ” গঠনের মাধ্যমে তুরস্ককে বিচ্ছিন্ন করতে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এরদোয়ানের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে।
এরদোয়ানের কারণে ইসরায়েল এই প্রতিটি লক্ষ্যেই ব্যর্থ হয়েছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে ক্রমবর্ধমানভাবে অত্যন্ত বৈরীভাবে চিত্রিত করছেন। নেতানিয়াহুর দপ্তর তাকে “ইহুদি-বিদ্বেষী স্বৈরশাসক” আখ্যা দিয়েছে। তবুও, আবু আল-দুহুরের ওপর ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় তুরস্কের প্রতিক্রিয়া ছিল সংযত।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
গাজার জন্য গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় থাকা আন্দোলনকর্মীদের ওপর ইসরায়েলের মে মাসের হামলার ঘটনায় গণহত্যার অভিযোগে আঙ্কারা সম্প্রতি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির অনুরোধ করেছে।
একই সময়ে, তুরস্ক ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা ইসরায়েলের উত্তেজনা বৃদ্ধিতে আগ্রহী নয় এবং নেতানিয়াহুর ফাঁদে পা দেবে না, তবে সিরিয়াকে সমর্থন অব্যাহত রাখার ইচ্ছাও পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এই সংঘাত দুটি ভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে। ইসরায়েলকে কৌশলগত হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে, এই প্রত্যাশায় যে তার একক পদক্ষেপগুলো পার্শ্ববর্তী পরিবেশে অস্থিতিশীলতা, বিভাজন এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে টিকিয়ে রাখার বৃহত্তর কৌশলগত উদ্দেশ্য সাধনে অবদান রাখতে পারবে। অন্যদিকে, তুরস্ক এর বিপরীত লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে।
যদিও তুরস্কের নীতি নির্ধারকরা ইসরায়েলের সাথে সরাসরি সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করেছেন, তবুও তুরস্কের স্বার্থের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আরও পদক্ষেপের সম্ভাবনা তাদের উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। ইসরায়েল বারবার চরমপন্থী, অযৌক্তিক ও বেপরোয়া আচরণে লিপ্ত হওয়ার এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ও অত্যন্ত সংঘাতপূর্ণ পদক্ষেপ বেছে নেওয়ার সদিচ্ছা প্রদর্শন করেছে।
ইসরায়েল হায়োম-এর এই প্রতিবেদন যে, ইসরায়েল ন্যাটোর ৫ নং অনুচ্ছেদ কীভাবে কাজ করে তা ‘অধ্যয়ন’ করেছে এবং ন্যাটোর হস্তক্ষেপ ছাড়াই তুর্কি সৈন্যদের ওপর হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছে, তার মানে হলো ইসরায়েলের পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে তুরস্কের বাইরে থাকা তুর্কি সৈন্য, সরঞ্জাম বা ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা।
তুরস্কের পক্ষ থেকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতা ইসরায়েলকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে উৎসাহিত করতে পারে । এই প্রেক্ষাপটে, তুরস্ককে অবশ্যই শান্ত থাকতে হবে, অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে হবে এবং সম্ভাব্য সংঘাতের সম্ভাবনা নাকচ না করে কৌশলগতভাবে চিন্তা চালিয়ে যেতে হবে।
আঙ্কারার প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল, ঐক্যবদ্ধ ও সার্বভৌম সিরিয়ার একত্রীকরণ এবং তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু সংযমকে নিষ্ক্রিয়তার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়: আঙ্কারাকে ইসরায়েলি আগ্রাসনের আরও বৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং তার কর্মী ও স্বার্থ রক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে, পাশাপাশি সুস্পষ্ট সীমারেখা জানিয়ে দিতে হবে।
সবচেয়ে কার্যকর প্রতিক্রিয়া হয়তো তাৎক্ষণিক সামরিক সংঘাত বৃদ্ধি নয়, বরং কৌশলগত ধৈর্য, প্রতিরোধ, কূটনীতি, সামরিক প্রস্তুতি এবং সিরিয়া ও এই অঞ্চলে অব্যাহত সম্পৃক্ততার একটি সমন্বয়।
সুতরাং তুরস্কের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ইসরায়েলকে সংঘাতের শর্ত ও সময় নির্ধারণ করতে না দেওয়া এবং একই সাথে এটা নিশ্চিত করা যে সংযম যেন এমন ধারণা তৈরি না করে যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তার কোনো পরিণতি হবে না।
- আলী বাকির: ইবন খালদুন মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান কেন্দ্রের একজন গবেষণা সহকারী অধ্যাপক। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

