দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় অংকের আমানত রাখা ধনী ব্যক্তিদের প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে কমছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবের বড় অংশই প্রতিষ্ঠানভিত্তিক, ব্যক্তিগত হিসাব তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে এমন মোট হিসাব ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার। এর মধ্যে ব্যক্তিগত হিসাব মাত্র ২৮ শতাংশ, আর বাকি প্রায় ৭২ শতাংশই প্রাতিষ্ঠানিক।
ব্যক্তি পর্যায়ে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৪৩৬টি। এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা মোট বড় অংকের আমানতের মাত্র ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
২৫ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে—এমন হিসাবের সংখ্যা আরও কমে গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে যেখানে এ ধরনের হিসাব ছিল ১৮৫টি, এক বছরের ব্যবধানে তা নেমে এসেছে ১২০টিতে। একই সময়ে আমানতের পরিমাণও প্রায় অর্ধেকে নেমে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা থেকে কমে ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবেও একই ধারা দেখা গেছে। ২০২৪ সালে যেখানে ৪৪টি হিসাব ছিল, ২০২৫ সালে তা কমে মাত্র ১৩টিতে নেমে আসে।
ব্যাংকারদের মতে, দেশের অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি বড় অংকের অর্থ ব্যাংকে না রেখে জমি, বাড়ি, স্বর্ণ বা বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ করছেন। কেউ কেউ বিদেশে সম্পদ স্থানান্তর করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কর ঝামেলা, নজরদারির আশঙ্কা এবং ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থার ঘাটতিও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক ধনী ব্যক্তি একটি অ্যাকাউন্টে বড় অংক না রেখে বিভিন্ন ব্যাংকে ছোট ছোট অংকে টাকা ভাগ করে রাখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশে এত কম সংখ্যক ব্যক্তিগত বড় আমানত থাকা অস্বাভাবিক। এতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রকৃত সম্পদের বড় অংশ ব্যাংকের বাইরে রয়েছে। আগে কোটি টাকার বেশি হিসাবের তথ্য প্রকাশ করা হলেও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাব আলাদা করে দেখানো হতো না। ফলে অনেকেই ধরে নিতেন দেশে কোটিপতির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এবার আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ হওয়ায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে—বড় অংকের হিসাবের বেশিরভাগই প্রতিষ্ঠানের।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট ব্যাংক হিসাব ছিল প্রায় ১৭ কোটি ৭৯ লাখ। এসব হিসাবে মোট আমানত দাঁড়ায় ২১ লাখ ৫৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিগত হিসাবে জমা রয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে রয়েছে ৯ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। দেশে বড় অংকের আমানত কমলেও বিদেশে, বিশেষ করে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ বেড়েছে। ২০২৪ সালে সেখানে জমার পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি।
বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই ধনীরা এক জায়গায় বড় অংকের টাকা রাখেন না। তারা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেন। তবে দেশের ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থার ঘাটতি থাকলে বড় আমানত আরও কমতে পারে। তাঁদের মতে, করব্যবস্থা সহজ করা, আইনি জটিলতা কমানো এবং ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে ধনীদের আমানত আবার বাড়তে পারে।

