মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে কয়েক মাসের কাঁচামাল মজুদ রয়েছে, তবে যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষত, পেট্রোকেমিক্যালের ওপর নির্ভরশীল কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সমস্যাটি আরও প্রকট হয়েছে। এক্ষেত্রে, কিছু মাস আগেও যেসব কাঁচামালের দাম ছিল একদম নিয়ন্ত্রণে, এখন তা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বিশেষত, তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৬০ ডলার থেকে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে কেমিক্যাল এবং ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণগুলোর ওপর।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, “যুদ্ধের ফলে পেট্রোকেমিক্যাল নির্ভর কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। তবে যদি যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়, তবে এই সমস্যা কিছুটা কমতে পারে।”
অবশ্য, কাঁচামালের দাম বাড়লেও এখনও দেশের ওষুধ শিল্পের সরবরাহের প্রক্রিয়া ঠিকমতো চলছে। সাপ্তাহিক এশিয়া এক্সপোতে অংশগ্রহণকারী ওষুধ কোম্পানির মালিকরা জানান যে, আপাতত কোনো বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়নি। তবুও, যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা বাড়ে, তবে ভবিষ্যতে এই সংকটের প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
বিভিন্ন কাঁচামাল সরবরাহকারী কোম্পানির মতে, বর্তমানে গ্যাস সংকট এবং কিছু বেসিক ইন্টারমিডিয়েটের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলছে। তবে, এই পরিস্থিতি সত্ত্বেও খুচরা মূল্য (এমআরপি) অপরিবর্তিত রয়েছে, যার ফলে অনেক কোম্পানি লোকসান গুনছে।
এদিকে, ভারতের বিশেষায়িত কনট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লি ফার্মারের পরিচালক রঘু মিত্র এ. বলেন, “কাঁচামাল সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে নতুন অর্ডার গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না। যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি ২-৩ মাসের বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে সংকট আরো তীব্র হবে।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের বিকল্প উৎস খোঁজা জরুরি। তবে, এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্ভব নয়, কারণ নতুন উৎস থেকে কাঁচামাল আনতে দীর্ঘ সময় এবং জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন। বিএপিআই-এর মহাসচিব ডা. মোহাম্মদ জাকির হোসেন এ বিষয়ে বলেন, “নতুন উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া প্রায় ৯-১৪ মাস সময় নিতে পারে।”
তবে, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ সরকারও উদ্যোগী হয়েছে। গত মার্চে অনুষ্ঠিত ‘এশিয়া ফার্মা এক্সপো’তে স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাকুল সরকারের প্রতিশ্রুতি জানান যে, তারা ওষুধ খাতের উন্নয়নে পূর্ণ সমর্থন প্রদান করবে।
এছাড়া, প্রতিবছর অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে চারশ’র বেশি প্রদর্শক অংশ নিয়েছেন, যেখানে ফার্মাসিউটিক্যাল প্রসেসিং, প্যাকেজিং, এপিআই, ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি ও ক্লিনরুমের প্রযুক্তি উপস্থাপন করা হচ্ছে।
বর্তমানে, সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা না থাকলেও কিছু কাঁচামাল ও প্রাইমারি প্যাকেজিং উপকরণের দাম ইতোমধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, ভবিষ্যতে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন চালানে বাড়তি দামের প্রভাব পড়তে শুরু করবে।
এই সংকটের মধ্যেও, সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, যাতে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর উৎপাদন অব্যাহত থাকে। তবে, যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত না কাটে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে।

