রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান খুঁজতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সক্রিয় হচ্ছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ একদিকে যেমন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়েও সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ছয় দফায় মোট ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জনের তথ্য মিয়ানমার সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জনের তথ্য যাচাই করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া যাচাইকৃতদের মধ্যে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৪ জনকে মিয়ানমারে পূর্বে বসবাসকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত চলমান থাকায় এই মুহূর্তে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং সম্মানজনকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। এ লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ কেবল কূটনৈতিক উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ নেই; আইনি ও মানবিক ক্ষেত্রেও সমানভাবে সক্রিয় রয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে রোহিঙ্গা ইস্যুকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রত্যাবাসনকে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়। এটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রথম উচ্চপর্যায়ের আয়োজন, যা আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ নামে এই মামলার মূল শুনানি চলতি বছরের ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ শুরু থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এই মামলার ব্যয় নির্বাহে বাংলাদেশ অন্যান্য মুসলিম দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে এবং ভবিষ্যতেও এ সহায়তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগকে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
এছাড়া জেনেভায় চলমান জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনেও রোহিঙ্গা ইস্যু গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। মিয়ানমার বিষয়ক প্রস্তাবের মাধ্যমে বিষয়টি বৈশ্বিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গত ১২ মার্চ জেনেভায় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করে বাংলাদেশ। সেখানে রোহিঙ্গাদের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি, প্রত্যাবাসনের পথে বিদ্যমান বাধা এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, আসন্ন মুসলিম দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রস্তাবগুলোর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত অবস্থান তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, এই দুটি প্রস্তাবের খসড়া প্রণয়ন এবং আলোচনা প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে, যা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দেশের সক্রিয় ভূমিকারই প্রতিফলন।

