দেশে হামের টিকাদানে গত বছর বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটেছে। ২০২৫ সালে মাত্র ৫৬.২% শিশু হামের টিকা পেয়েছে, যা ৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম হার। এর ফলে প্রায় ৪৪% শিশু হামের টিকার বাইরে রয়ে গেছে, এবং বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে এই শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
হামের টিকাদান কভারেজে কমতি: স্বাস্থ্য সমস্যা আরও গভীর হচ্ছে
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, টিকাদানের কমতি ভবিষ্যতে হামের সংক্রমণকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষত, যেসব শিশু কোনো ডোজ টিকা নেয়নি বা আংশিক টিকা নিয়েছে, তাদের মধ্যে সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি। সেক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রতিরোধে উদ্যোগী হতে হবে, এবং তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে।
সামাজিক মাধ্যম ও সরকারি প্রতিক্রিয়া
হামের টিকাদানে সাফল্যের বিষয়ে সমাজমাধ্যমে সঙ্কটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর, ইপিআইয়ের ওয়েবসাইট থেকে সংশ্লিষ্ট কভারেজ তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়। যদিও তথ্যটি এখনও সমকাল পত্রিকায় পাওয়া যাচ্ছে, তবে এই পরিস্থিতি জানিয়ে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে কোন মন্তব্য করেননি।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য: সমস্যার গভীরতা স্বীকার
২০২৫ সালের টিকাদান কভারেজে হোঁচট খাওয়ার বিষয়ে ইপিআইয়ের ব্যবস্থাপক ডা. আবুল ফজল মো. শাহাবুদ্দিন খান বলেছেন, হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্টদের তিন দফা কর্মবিরতি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেছে। “অপারেশনাল প্ল্যান” বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কর্মী সংখ্যা কমে গিয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: আগাম পদক্ষেপের প্রয়োজন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, হামের মতো সংক্রামক রোগের জন্য ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমানে এই হার অনেক নিচে নেমে গেছে, যার কারণে হাজার হাজার শিশু এখন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আর টিকাদান কভারেজ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি টিকাদান কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব এবং অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবকে চিহ্নিত করেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ: টিকা নিয়ন্ত্রণে অনিশ্চয়তা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তবে ২০২৫ সালের হামের টিকার তথ্য সেখানে পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সংকটের সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় হামের সংক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক বিশেষজ্ঞের মন্তব্য:
বিশ্বব্যাংকের সাবেক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে সমস্যার প্রকৃতি বদলে গেছে। তিনি জানান, সংকট নিরসনে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
রাজশাহীতে হামের প্রাদুর্ভাব: আশঙ্কাজনক অবস্থা
রাজশাহীর রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮ শিশু ভর্তি আছে, যার মধ্যে ৬৫ শতাংশ শিশু টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৬ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি হওয়ায়, টিকার বয়সসীমা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে হাসপাতালে চাপ: হামের রোগী বাড়ছে
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার হাসপাতালেও হামের রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে, যেখানে এক ২০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিটে গত মার্চ মাসেই ২৮৬ শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে ৭৭ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে ৪টি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, টিকাদান জোরদার, ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ এবং পুষ্টি নিশ্চিত করার ওপর মনোযোগ দিতে হবে।
অন্যান্য জেলায় উদ্বেগ: চট্টগ্রাম ও গোপালগঞ্জ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও এক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে এবং আরও বেশ কয়েকটি শিশুর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে। গোপালগঞ্জে, হামের উপসর্গ নিয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ছয়টি শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। শরীয়তপুরে ২৫ জন শিশুর নমুনা পরীক্ষা করার পর ১৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
রাজশাহী শিশু হাসপাতাল চালু: সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ
রাজশাহীতে শিশুমৃত্যু বৃদ্ধির পর, অবশেষে তিন বছর ধরে বন্ধ থাকা ২০০ শয্যার রাজশাহী শিশু হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে হাসপাতালটি আংশিকভাবে চালু হবে।
চূড়ান্ত পদক্ষেপ: সচেতনতা বাড়াতে বিশেষ প্রচেষ্টা
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক না ছড়িয়ে, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও পদক্ষেপ গ্রহণই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ। তাই দ্রুতভাবে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, ঝরে পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শিগগিরই নেওয়া হবে, যাতে পিছিয়ে পড়া শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হবে। তবে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, হামের সংক্রমণ আরও বেড়ে শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

