দেশে স্বাস্থ্য সূচকে অগ্রগতি হলেও সরকারি ব্যয়ে এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম বরাদ্দের পাশাপাশি পরিকল্পনার ঘাটতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে জনগণের বড় একটি অংশ এখনও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।
স্বাধীনতার পর গত কয়েক দশকে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচিও বিস্তৃত হয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটলেও এখনো অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা সহজে পাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট, ওষুধের ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব এই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে তারা দেখছেন স্বাস্থ্য খাতে কম বরাদ্দ ও সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার না হওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো নিম্ন অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও এ খাতে ব্যয় তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে পরিচালন ব্যয়ের জন্য প্রায় ২৪ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৪.৫ শতাংশ। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থও ব্যয় করা সম্ভব হয় না। এর আগের অর্থবছরগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দের তুলনায় কম ব্যয় হয়েছে এবং সরকারের মোট ব্যয়ের মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশের মতো স্বাস্থ্য খাতে খরচ হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। যেখানে মালদ্বীপ, ভুটান বা শ্রীলংকা তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয় করে, সেখানে বাংলাদেশে এই হার অনেক কম। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত সরকারি মোট ব্যয়ের খুব সামান্য অংশই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে দেশে। বৈশ্বিক গড় ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তুলনায়ও এই হার কম।
স্বাস্থ্য খাতে সীমিত বিনিয়োগের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সেবার মানে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেশি হলেও সেবা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। ফলে অনেকেই বেসরকারি হাসপাতালে ঝুঁকছেন, যদিও সেখানে খরচ বেশি এবং মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ভুল রোগ নির্ণয়, পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, তদারকির অভাব—এসব কারণে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। সামর্থ্যবান অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না—প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো। তাদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি জনবল উন্নয়ন, অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে সীমিত সম্পদ দিয়েও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব।

