বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে জ্বালানি সংকট গভীর হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও কৃষি খাতে একযোগে সংকট তৈরি হয়েছে। লোডশেডিং বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সেচে জ্বালানির ঘাটতি—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রা বাড়ার কারণে দেশে জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে। তবে সেই অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং কৃষি কার্যক্রমে।
বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই ঘাটতি ২,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, ফলে দৈনিক কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হতে পারে মানুষকে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত গ্যাস, কয়লা ও তেলনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও বড় প্রভাব ফেলছে। গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। চাহিদা মেটাতে যে পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন, তার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিল্পখাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং ডিজেলের সংকটে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে দ্বিগুণ পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্প সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অর্ডার হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় দুটোই বড় ধাক্কা খেতে পারে।
কৃষিখাতেও সংকট বাড়ছে। সেচ মৌসুমে ডিজেল না পাওয়ায় অনেক কৃষক সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না। সামনে বোরো ধান কাটার মৌসুমেও জ্বালানি ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে, যা উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। দেশে বিপুল সংখ্যক কৃষিযন্ত্র ডিজেলনির্ভর হওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
এদিকে গ্যাসের অভাবে সার কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কৃষিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। প্রয়োজন মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
গণপরিবহনেও দেখা দিয়েছে সংকট। ডিজেলের ঘাটতির কারণে অনেক রুটে বাস চলাচল কমে গেছে, ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও কমে গেছে, যার প্রভাবে সড়কে যানবাহনের চাপ কিছুটা কমলেও যাতায়াতে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতা বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি সাশ্রয়, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি বলে তারা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি সংকট দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে বিদ্যুৎ, শিল্প ও কৃষি—তিন খাতেই বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

