বিশ্বব্যাপী বর্জ্য উৎপাদন এমন হারে বাড়ছে যা পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। পরিবেশগত ঝুঁকি, অর্থনৈতিক চাপ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, যেখানে বাংলাদেশও শীর্ষ তিনে আছে, এখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
বর্জ্য উৎপাদন বেড়ে যাচ্ছে আগের চেয়ে দ্রুত:
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের (‘হোয়াট আ ওয়েস্ট ৩.০’, ২০২৬) তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বর্জ্যের পরিমাণ দাঁড়াবে ২.৫৯ বিলিয়ন টন। ২০৫০ সালে এটি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৮৬ বিলিয়ন টনে পৌঁছাবে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারা আফ্রিকায় এই প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে মিলিতভাবে দেশটি অঞ্চলের মোট পৌর কঠিন বর্জ্যের প্রায় ৯৭ শতাংশ উৎপাদনের জন্য দায়ী। শীর্ষ তালিকায় অবস্থান: প্রথম মালদ্বীপ, দ্বিতীয় পাকিস্তান, তৃতীয় বাংলাদেশ, এবং ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের পরে।
ঢাকা শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন:
নগর পরিকল্পনাবিদ এম এ তাহের জানিয়েছেন, ঢাকা সিটিতে বড় পরিমাণ বর্জ্য সরাসরি ওয়েস্ট-টু-এনার্জি পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা সম্ভব। বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের পর প্লাস্টিক ও কাগজ আলাদা করে রিসাইক্লিং করা হয়, অবশিষ্ট বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা যায়। আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, ১০ টন বর্জ্য থেকে ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে ৪০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। তবে বর্জ্য সংগ্রহ, এয়ার পলিউশন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ল্যান্ডফিল্ডের অভাব প্রধান চ্যালেঞ্জ।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্জ্য চিত্র:
২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় মোট ৩৪৬ মিলিয়ন টন পৌর কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। মাথাপিছু দৈনিক উৎপাদন গড়ে ০.৪৯ কেজি, যা বৈশ্বিক গড় ০.৮৮ কেজির তুলনায় কম। মোট বর্জ্যের প্রায় ৪৬ শতাংশ জৈব বর্জ্য— খাদ্য, বাগান বা কাঠজাত। বাকি ৩৬ শতাংশ প্লাস্টিক, কাগজ, কাচ ও ধাতুর মতো প্রক্রিয়াজাত উপাদান।
বর্জ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় গড় হার প্রায় ৬৭ শতাংশ। শহরে এটি ৮৮ শতাংশ, গ্রামে ৫৪ শতাংশ। তবে সংগ্রহের পর প্রায় ৩৮ শতাংশ বর্জ্য উন্মুক্ত ডাম্পিংয়ে ফেলা হয়, ৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রিত ল্যান্ডফিল্ডে রাখা হয়। কম্পোস্টিং ও অ্যানারোবিক ডাইজেশন মিলিয়ে ১১ শতাংশ, পুনর্ব্যবহার হয় আরও ১১ শতাংশ, আর মাত্র ৩ শতাংশ পুড়িয়ে নিষ্পত্তি করা হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা:
বাংলাদেশে মাথাপিছু দৈনিক বর্জ্য উৎপাদন ০.৫–০.৬ কেজি। বছরে মোট বর্জ্য দাঁড়ায় ২৫–৩০ মিলিয়ন টন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বার্ষিক উৎপাদন ৩৫.৮৩ মিলিয়ন টন, ২০৪০ সালে ৪০.২৬ মিলিয়ন টন এবং ২০৫০ সালে ৫০.৬৬ মিলিয়ন টনে পৌঁছাবে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে বর্জ্য সংগ্রহের হার ৬০–৮০ শতাংশ হলেও ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকায় ৫০ শতাংশের নিচে। ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য খোলা জায়গা, ড্রেন ও জলাশয়ে জমা হচ্ছে, যা জলাবদ্ধতা, দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল্ডসহ দেশীয় বড় ডাম্পিং সাইটগুলো অতিরিক্ত চাপের মধ্যে। আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ড এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা সীমিত।
বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫৫.০১ শতাংশ বর্জ্য অনিয়ন্ত্রিত ল্যান্ডফিল্ডে ফেলা হয়, ২০ শতাংশ অন্য পদ্ধতিতে, ১৯.৩৭ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ হয় না। পুনর্ব্যবহার মাত্র ৩.১৪ শতাংশ এবং দহন প্রক্রিয়ায় ০.২৯ শতাংশ। এছাড়া প্রায় ১ শতাংশ বর্জ্য উন্মুক্তভাবে ফেলা হয়।
সমস্যার মূল কারণ:
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাধাগুলোতে রয়েছে— পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব, সঠিক নিষ্পত্তি ও পুনর্ব্যবহারের সুবিধার অপ্রাপ্যতা, লিটারিং, উন্মুক্ত ডাম্পিং বা পোড়ানোর সামাজিক রীতি। এছাড়া ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতা, সময় ও অর্থের ব্যয় মনে হওয়া বাধা এবং টেকসই আচরণে অবহেলা।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা দেখায়, মানুষ পরিবেশবান্ধব মূল্যবোধ রাখলেও তা সব সময় টেকসই আচরণে পরিণত হয় না। প্রায়ই সবচেয়ে সহজ বা পরিচিত পদ্ধতিই ব্যবহার হয়, যেমন বাংলাদেশে প্লাস্টিকের হালকা পাত্রে পানি সংরক্ষণ।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় টেকসই পরিবর্তনের জন্য আচরণভিত্তিক পদক্ষেপ কার্যকর। এর মধ্যে রয়েছে— সহজ সচেতনতামূলক প্রচারণা, স্পষ্ট সাইনেজ, রংভিত্তিক বিন, সামাজিক মান তৈরি, স্বীকৃতি ও পুরস্কারের মাধ্যমে ইতিবাচক আচরণ উৎসাহিত করা। এছাড়া ধাপে ধাপে পরিকল্পনা পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও সমন্বয় অপরিহার্য।
বাংলাদেশের করণীয়: বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে—
- শতভাগ বর্জ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করা
- কম খরচে কম্পোস্টিং ও বায়োগ্যাস প্রকল্প বাড়ানো
- আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ড স্থাপন
- অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা
বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বর্জ্যকে সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। উৎপন্ন বর্জ্যের অর্ধেকের বেশি জৈব, যা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করলে সম্পদে রূপান্তর সম্ভব।
নগর পরিকল্পনাবিদ এম এ তাহের বলেছেন, “দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কঠিন বর্জ্যের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে অধিকাংশ শহরে বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। খোলা ডাম্পিং ও অনিয়ন্ত্রিত ল্যান্ডফিল্ডের ওপর নির্ভরতা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কার্যকর সমাধান হলো ইন্টিগ্রেটেড সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি, যা উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট ও বায়োগ্যাস উৎপাদন, এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ রিসাইক্লিংকে সহজ করবে। অবশিষ্ট বর্জ্য স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ডে বৈজ্ঞানিকভাবে নিষ্পত্তি করা হলে জমির ব্যবহার কমবে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।

